সরেজমিনে অনুসন্ধান

রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ‘মিলেমিশেই লুট করেছে সাদাপাথর’

  • ধূ ধূ বালুচর আর ছোট-বড় গর্তে ভরপুর
  • স্থানীয় পাশাপাশি লুট করেছে ভাড়াটে শ্রমিক 
  • বহিষ্কার বিএনপি নেতা
  • জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকও জড়িত থাকার গুঞ্জন
  • কোনো ব্যর্থতা ছিল না, পদক্ষেপ চলমান: প্রশাসন 
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫, ০৯:৫৩ পিএম

সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জে অবস্থিত পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরের জন্য দেশজুড়ে চলছে হাহাকার। নয়নাভিরাম সাদাপাথরের বর্তমান দৃশ্য কেউ মেনে নিতে পারছে না, যে পাথরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলধারার সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন ছুটে যেতেন সারা দেশের পর্যটকরা। সেই পাথর মাত্র কয়েকদিনে ‘নাই’ হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানকার ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা ‘মিলেমিশেই শেষ করেছে সাদাপাথর’।

মঙ্গলবার সরেজমিনে সাদাপাথর ঘুরে দেখা গেছে, এখন সেখানে ধূ ধূ বালুচর আর ছোট-বড় গর্তে ভরপুর। মাটি খুঁড়ে পাথর লুটে নেওয়ার পর গর্তগুলো হা করে আছে। সাদাপাথর লুটের ভিডিও এবং লুটের পরে সাদাপাথরের বর্তমান দৃশ্য নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর তা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সবাই। একটি পর্যটনকেন্দ্রকে এভাবে ‘খুন’ করা হলেও- তা ঠেকাতে প্রশাসন কী ভূমিকা রেখেছে সে প্রশ্নও উঠেছে।

অবশ্য স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা বলছেন, সাদাপাথর রক্ষায় তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাদা পাথর লুট ঠেকাতে প্রশাসনের কোনো ব্যর্থতা ছিল না। প্রশাসনের পদক্ষেপ চলমান রয়েছে, প্রায় প্রতিদিনই সেখানে অভিযান হচ্ছে। অনেকগুলো মামলাও হয়েছে।’

এরপরও কীভাবে পাথর লুট হলো এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি সভা আহ্বান করেছি। ওই সভায় সাদাপাথর রক্ষায় আরও কী করণীয় আছে তা নির্ধারণ করা হবে।’

সাদাপাথর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, সেখানকার বিজিবি ক্যাম্পের আশপাশের কিছু পাথর ছাড়া সব পাথরই লুট হয়ে গেছে।

তারা আরও জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই থেমে থেমে পাথর লুট চলছিল। তবে সম্প্রতি অবাধে লুটে নেওয়া হয়েছে প্রায় সব পাথর।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, পাথর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, পাথর ভাঙার মিল মালিকসহ সবাই মিলেমিশেই শেষ করেছে সাদাপাথর।

স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি বাইরে থেকে শ্রমিক এনে দিনেরাতে নৌকা ভরে লুটে নেওয়া হয়েছে পাথর।

সাদাপাথর লুটের খবর দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টির পর গতকাল সোমবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের পদ স্থগিত করেছে বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ বিএনপির আদর্শ ও নীতি পরিপন্থী অনৈতিক কর্মাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের সকল পদ স্থগিত করা হয়েছে।’

জানা গেছে, সাদাপাথর লুটপাটে প্রথম থেকেই বিএনপি নেতা সাহাব উদ্দিন সংশ্লিষ্ট রয়েছেন বলে আলোচনা শুরু হয়। তিনিসহ প্রভাবশালীচক্র কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরসহ বিভিন্ন কোয়ারির পাথর ও বালু লুট শুরু করে।

এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদীর সেতুর আশেপাশের এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু লুটে সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এখানে একটি বালু মহালের ইজারাদার হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা আলফু মিয়া। ৫ আগস্টের পর তিনি কিছুটা বেকায়দায় পড়ায় তার প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন যুবদল নেতা মকসুদ। ধলাইসেতু রক্ষায় আন্দোলনে নামা লোকজনকে মকসুদ ও তার পক্ষের লোকজন ভয়ভীতি দেখান বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অবশ্য মকসুদ আহমদ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘আলফু চেয়ারম্যানের ভায়রাভাই আবদুল্লাহ আল মামুন আমার তালতো ভাই। এজন্য স্থানীয় বিএনপি মনে করছে— এই বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমি জড়িত। বিষয়টি সঠিক নয়। আসলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিন (বর্তমানে পদ স্থগিতকৃত) এই বালুমহাল থেকে আগেও টাকা নিয়েছেন, এখন আরও বেশি করে টাকা নেওয়ার জন্য বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।’

পাথর-বালু লুট প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘সাদা পাথরে যে লুটপাট হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। যারাই এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এসব ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে দল তাৎক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। চাঁদাবাজ ও লুটপাটকারীদের স্থান বিএনপিতে নেই।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত