জমাটবাঁধা সিমেন্টে সড়ক ঢালাই!

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৬ এএম

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সদর ইউনিয়নের উত্তর কাজির হাওলা মোহসেনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে খালগোড়া বাজার পর্যন্ত একটি সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় ওই সড়ক নির্মাণে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে গিয়েও পাওয়া গেছে অনিয়মের প্রমাণ। দেখা যায়, সড়কটি আরসিসিসি ঢালাইয়ে কাদামাটি মেশানো বালু-পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মধ্যে দেওয়া হচ্ছে আবার জমাট বেঁধে চাক চাক হয়ে যাওয়া সিমেন্ট। নির্ধারিত মাপের তুলনায় কম দেওয়া হচ্ছে রড।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিময়-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্মাণকাজের শুরু থেকেই ঠিকাদারের লোকজন এই অনিয়ম-দুর্নীতি করে চলছেন। সংশ্লিষ্টরা এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন। যার কারণে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এবং কাজ ফাঁকি দিয়ে ঠিকাদার লাখ লাখ টাকা লোপাট করছেন।

প্রতিবেদক সরেজমিনে গেলে খবর শুনে ছুটে আসেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন। জমাটবাঁধা চাক সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি সিমেন্টে চাক ধরেনি। বৃষ্টির পানি পেয়ে দুই-একটি সিমেন্টে এ রকম টুকরা হয়েছে। টুকরাগুলো আমরা ফেলে দিচ্ছি। এখন দেব না।’ কাদামাটি মেশানো বালু-পাথর ব্যবহারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পাথরে ময়লা নাই। আপনি যদি বলেন তাহলে ধুয়ে দিবো।’

জানা গেছে, প্রাক্কলন অনুযায়ী ৭ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৭ ইঞ্চি প্রস্থের ঘনত্ব দিয়ে রডের জালি করার কথা। কিন্তু গত সোমবার দেখা যায় ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৯ ইঞ্চি প্রস্থের ঘনত্ব দিয়ে জালি করা হয়েছে। প্রকল্পে নির্ধারিত রডের কম ব্যবহারের বিষয়ে রুহুল আমিন দাবি করেন, তাকে প্রকৌশলী ৮ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চি রড বাঁধতে বলেছেন। তিনি সে অনুযায়ী মিস্ত্রিদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

নির্মাণকাজের রাজমিস্ত্রি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী রডের জালি বেঁধেছি। জালির ঘনত্ব ৯ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং ৯ ইঞ্চি প্রস্থ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘রড কম, তাই ঠিকাদার এভাবে করতে বলছেন। এর আগে যতটুকু করেছি তাতে ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য এবং ৮ ইঞ্চি প্রস্থ দিয়েছি।’

শ্রমিক সরদার ওয়াহাব হোসেন বলেন, ‘আমাদেরকে আর পাথর বা বালুর ময়লা-কাদা পরিষ্কার করা আমাদের কাজ না। আমরা কি করবো? সিমেন্টের মধ্যেও চাক চাক। অনেক চাক ফেলে দিয়েছি।’

এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ এবং শক্তিশালীকরণ (বিডিআইআরডব্লিউএসপি) প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গাবালী উপজেলার কাছিয়াবুনিয়া (খালগোড়া) লঞ্চঘাট বাজার থেকে বাহেরচর বাজার (উত্তর কাজির হাওলা মোহসেনিয়া মাদ্রাসা) পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার আরসিসি সড়ক নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৫ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ২০৯ টাকায় কাজটি পায় রাজশাহীর সাহেব বাজার এলাকার বরেন্দ্র কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুরু হওয়া এই কাজের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ। ৬০০ মিটার সড়ক আরসিসিকরণ কাজ শেষ হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কাজটি করছেন দশমিনা উপজেলা সদরের বাসিন্দা জুয়েল মোল্লা। তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বলছি ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করতে। ডিজাইনের বাইরে কাজ করতে নিষেধ করেছিলাম। পাথর যেখানে রাখছি, সেখানে জোয়ারের পানি ওঠে। অন্য কোনো জায়গা পাই নাই। আপনার কথা সব সঠিক আছে। পরবর্তী সময় এ রকম আর হবে না। আমি আপনাকে ওয়াদা দিলাম।’

জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদার আমাদের জানিয়ে কাজ শুরু করার কথা। কিন্তু  গত সোমবার আমাকে অবগত না করে কাজটি শুরু করেছিল। বিষয়টি শুনে আমার প্রতিনিধি গিয়ে কাজটি বন্ধ করেছেন। ঠিকাদারকে আমরা বলে দিয়েছি ডিজাইন অনুযায়ী ঢালাই প্রস্তুত করতে। আমরা পরীক্ষা করব, তারপর কাজ করব।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, ‘উন্নয়ন কাজে কোনো ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। ঠিকাদার কিংবা যে কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত