গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জটিলতা ও প্রতিকার

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:২৪ এএম

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মেলাইটাস (Gestational Diabetes Mellitus-GDM) হলো গর্ভাবস্থায় প্রথম শনাক্ত গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা। এই ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থাকে প্রভাবিত করে, যা মা ও গর্ভস্থ শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত গর্ভাবস্থায় ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহে যখন প্লাসেন্টাল হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পায় তখন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা GDM প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে এই হার শতকরা ৬ থেকে ৮ ভাগ।

ঝুঁকিতে যারা : বয়স ২৫-এর অধিক হলে। যাদের আগে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ছিল। যাদের ওজন বেশি (BMI>২৫ কেজি/মিটার২)। আগে ৪.৫ কেজির বেশি ওজনের শিশুর জন্মদান। যাদের বংশে ডায়াবেটিস আছে।

রোগ নির্ণয় : যারা উচ্চমাত্রায় ঝুঁকিতে তাদের প্রেগনেন্সি নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। যাদের রক্তে এই সময় শর্করা স্বাভাবিক থাকে, তাদের ২৪-২৮ সপ্তাহে অবশ্যই পুনরায় সুগার পরীক্ষা করতে হবে। আমেরিকান ডায়াবেটিক সমিতির মতে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মাত্রা-

খালি পেটে >= ৯২ সম /ফষ (mg /dl (<= 5.1 mmol/L)৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাবার ১ ঘণ্টা পর >= ১৮০ সম/ফষ (mg/dl (>= 10 mmol/L)২ ঘণ্টা পর >= ১৫৩ mg/dl (>= 8.5 mmol/L

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জটিলতাসমূহ : গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

মায়ের জটিলতাসমূহ : রক্তে শর্করা অনিয়ন্ত্রিত

থাকলে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া বা অ্যাবরশন, প্রিটার্ম লেবার, প্রি-এক্লামশিয়া, এক্লামশিয়া, পলি হাইড্রাম নিওস (অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের অতিরিক্ত জমা)

পেটে সন্তান মারা যাওয়াসহ প্রসবকালীন নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়।

নবজাতকের জটিলতা :নবজাতকের অতিরিক্ত ওজন (Macrosomia)।

শিশুর জন্মগত ত্রুটি: হার্টের ভালবের ত্রুটি (যেমন: VSD), মেরুদন্ডের ত্রুটি (Spina bifida), অন্ত্রের ত্রুটি (Duodenal atresia)।

প্রসব-পরবর্তী সমস্যা :হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তের শর্করা কমে যায়)।

হাইপার বিলিরুবিনেমিয়া (রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়)।

শ্বাসকষ্ট (Respiratorydistress syndrome)|।

মা ও শিশু উভয়েরই টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা : খাদ্য নিয়ন্ত্রণ : শর্করা ও চর্বিযুক্ত খাবার কম খেতে হবে। বেশি ফাইবার যুক্ত খাবার যেমন প্রচুর শাক-সবজি এবং টক জাতীয় ফল এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। দিনে তিনটা প্রধান ও ২-৩টা হালকা নাস্তা খেতে হবে।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত দিনে ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম, যেমন হাঁটা, সাঁতার কাটা ও যোগ ব্যায়াম রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

রক্তের শর্করা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।

বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে সকালে খালি পেটে এবং সকাল, দুপুর, রাতে খাবার ২ ঘণ্টা পর রক্তের শর্করা মাপতে হবে এবং রিপোর্ট অনুযায়ী রক্তের সুগার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

খাদ্যাভাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও শর্করা নিয়ন্ত্রণে না এলে ইনসুলিন ব্যবহার করতে হবে। ইনসুলিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করে না, ফলে গর্ভস্থ শিশুর জন্য নিরাপদ। কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিনের সহায়ক অথবা বিকল্প হিসেবে মেটফরমিন ব্যবহার করা হয়। তবে মেটফরমিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করে এবং ইনসুলিনের মতো কার্যকর নয়।

মাকে চাপমুক্ত ও আত্মবিশ্বাসী রাখতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও ব্যায়াম বা নিয়মিত হাঁটতে উৎসাহিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক কমে যায়।

সঠিক জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নিয়মিত সুগার মনিটরিং এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা নিরাপদ প্রসব ও মা এবং শিশুর সুস্থতার জন্য অতীব জরুরি।

সন্তান প্রসবের ৬-১২ সপ্তাহ পর মায়ের টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্যে OGTT পরীক্ষা করতে হবে।

একবার এউগ হলে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং পরবর্তী গর্ভধারণে পুনরায় এউগ হওয়ায় ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রসবের পর ডায়াবেটিস না থাকলেও মাকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে এবং নিয়মিত রক্তের সুগার পরিমাণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত