লাদাখে যেভাবে সংগঠিত হলো রক্তাক্ত ‘জেন জি’ বিক্ষোভ

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০৩ পিএম

একসময় ভারত-চীন উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু লাদাখে সম্প্রতি জেনারেশন জেড (জেন জি) নেতৃত্বাধীন সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে এখন পর্যন্ত চারজন নিহত ও অর্ধশত আহতের খবর পাওয়া গেছে। বুধবার শুরু হওয়া বিক্ষোভে আন্দোলকারীরা নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আঞ্চলিক কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

লাদাখের রাজধানী লেহ শহরে শিক্ষার্থীসহ বিক্ষোভকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে অন্তত চারজন নিহত হয় এবং ডজনখানেক আহত হয় বলে আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। সংঘর্ষের পর কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, সংঘর্ষে বহু নিরাপত্তা সদস্যও আহত হয়েছে।

গত ছয় বছর ধরে লাদাখের হাজারো মানুষ স্থানীয় নাগরিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও অনশন ধর্মঘট করেছে। তাদের দাবি—ভারতের সরাসরি কেন্দ্রীয় শাসনের বদলে সাংবিধানিক সুরক্ষা ও পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা। এতে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষমতা ফিরে পাবে।

ধারাবাহিক অনশন কর্মসূচির নেতৃত্বে থাকা শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক এক ভিডিও বার্তায় জানান, বুধবার হতাশ তরুণদের একাংশ সেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থেকে সরে আসে। এটা ছিল তরুণদের গণ জোয়ার, এক ধরনের জেন-জি বিপ্লব যা তাদের রাস্তায় নামিয়েছে।

তিনি সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশীয় আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করেন। বিশেষ করে চলতি মাসে নেপালে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পতনের ঘটনাকে উল্লেখ করেন তিনি।

লাদাখে কী ঘটল? দাবিগুলো কী? কীভাবে পরিস্থিতি এতদূর গেল? আর কেনইবা লাদাখের এই সঙ্কট এত গুরুত্বপূর্ণ?

সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হলো

বুধবার সকালে লাদাখ এপেক্স বডির নেতৃত্বে স্থানীয় কর্মীদের অনশন ধর্মঘট ১৫তম দিনে গড়ায়। এপেক্স বডি হলো সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এক যৌথ প্ল্যাটফর্ম।

দুই অনশনকারী, যাদের বয়স ৬২ ও ৭১, আগের দিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর প্রেক্ষিতে আয়োজকেরা স্থানীয় শাট ডাউনের ডাক দেন। পাশাপাশি, মোদি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বিলম্ব হওয়ায় প্রতিবাদকারীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন।

এসব বিষয়ে তরুণদের মনে এই চিন্তা কাজ করে ‘শান্তিপূর্ণ পথ কাজ করছে না।’ ওয়াংচুক বুধবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন।

এরপর তরুণেরা লেহ শহরের শহীদ স্মৃতি উদ্যানে থাকা অনশন মঞ্চ থেকে বেরিয়ে সরকারি ভবন ও বিজেপি অফিসের দিকে মিছিল নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। ঘটনায় চারজন নিহত হয়, একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, আর ডজনখানেক আহত।

এপেক্স বডির সমন্বয়ক জিগমাত পালজোর, ‘এটা লাদাখের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসা তরুণদের শহীদ করা হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে সরকারের দেওয়া ভুয়া প্রতিশ্রুতিতে মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মেছে।’

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অশান্ত জনতার’ সঙ্গে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ জনের বেশি নিরাপরাধ সদস্য আহত হয়। আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে পুলিশকে গুলি চালাতে হয়। এতে ‘কিছু হতাহতের’ ঘটনা ঘটে।

ওয়াংচুকই এই সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী বলে দাবি সরকারের। কারণ তিনি ‘আরব বসন্তধর্মী বিপ্লব ও নেপালের জেন-জি বিক্ষোভের’ কথা বলে মানুষকে উত্তেজিত করছেন। তবে ওয়াংচুক বলেছেন, তিনি কেবল সতর্ক করে এসেছেন যে তরুণদের ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, কিন্তু কখনোই সহিংসতার পক্ষে মত দেননি।

সোনম ওয়াংচুক

বিক্ষোভকারীরা কী চাইছে

২০১৯ সালে মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ও রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করে। পুরনো রাজ্যটির তিনটি অঞ্চল ছিল—মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর উপত্যকা, হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু এবং লাদাখ, যেখানে মুসলিম ও বৌদ্ধ উভয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ করে।

এরপর সরকার রাজ্যকে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে—জম্মু ও কাশ্মীর (যার একটি বিধানসভা আছে) এবং লাদাখ (যার নেই)। অর্থাৎ জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষ অন্তত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, কিন্তু লাদাখিরা সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।

লাদাখিরা এখন দাবি করছে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় সাংবিধানিক সুরক্ষা। ষষ্ঠ তফসিলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য স্বশাসনের কাঠামো দেওয়া আছে।

কিন্তু মোদি সরকার এখন পর্যন্ত রাজ্য মর্যাদা বা ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা কোনোটিই দেয়নি। এর পাশাপাশি চাকরির ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগে জম্মু-কাশ্মীরের একীভূত রাজ্যে চাকরির সুযোগ বেশি ছিল। এখন লাদাখিরা সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।

ওয়াংচুক বলেন, ‘তরুণেরা পাঁচ বছর ধরে বেকার, আর লাদাখ কোনো সাংবিধানিক সুরক্ষাও পাচ্ছে না। সমাজে অশান্তির এটিই মূল রেসিপি—তরুণদের বেকার রাখো, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নাও।’

লাদাখে সাক্ষরতার হার ৯৭ শতাংশ, যা ভারতের জাতীয় গড় ৮০ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, লাদাখে স্নাতকদের ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেকার—যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ। বুধবার সেই ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিদ্দিক ওয়াহিদ বলেন, ‘লাদাখে যা ঘটছে তা ভয়াবহ। গত ছয় বছরে লাদাখিরা বুঝতে পেরেছে তাদের পরিচয় বিপন্ন। তাই তারা অধিকার ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে অটল। তরুণদের ক্ষোভ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তারা অধীর। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর তারা ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছে।’

লাদাখে কি আগেও আন্দোলন হয়েছে

লাদাখে অতীতে আন্দোন হয়েছে। ২০১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পর থেকে স্থানীয় সংগঠনগুলো নানা প্রতিবাদ, মিছিল ও অনশন করেছে।

ওয়াংচুক গত তিন বছরে পাঁচবার অনশন করেছেন। তার পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনের কারণে তিনি আগেই পরিচিত ছিলেন। তার জীবনকাহিনী নিয়ে বলিউডের এক বিখ্যাত থ্রি ইডিয়টস নির্মিত হয়েছে যা চীনে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

যেখানে অনশন কর্মসূচি হচ্ছিল—শহীদ স্মৃতি উদ্যান—সেটি উৎসর্গ করা হয়েছে তিন লাদাখিকে, যারা ১৯৮৯ সালের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তখন লাদাখিরা কাশ্মীরি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিল। একই স্থানে ১৯৮১ সালে তফসিলি উপজাতি মর্যাদার দাবিতে নিহত দুই বিক্ষোভকারীকেও স্মরণ করা হয়।

কিন্তু বুধবারের ঘটনাই লাদাখের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। সরকারের আলোচনাকারী কমিটির সদস্য সাজাদ কারগিলি বলেন, এই সহিংসতা লাদাখি তরুণদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। সরকারকে বুঝতে হবে এখানে এমন তরুণ আছে যারা ক্ষুব্ধ এবং শুধু অনশন করে বসে নেই।

লাদাখ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

লাদাখ ভারতের হিমালয় সীমান্তে অবস্থিত, যার পূর্ব দিকে রয়েছে চীন। এটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক রাস্তাঘাট, বিমানঘাঁটি এবং পরিবহন পথের সঙ্গে যুক্ত। ২০২০ সালে লাদাখের সীমান্তে ভারত-চীন সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হয়েছিল।

তখন থেকেই লাদাখ ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াহিদ বলেন, ২০১৯ সালে মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত এখন নতুন এক অভ্যন্তরীণ হুমকি হয়ে ফিরে এসেছে। আগে কেবল কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ সামলাতে হত, এখন তার সঙ্গে লাদাখও যুক্ত হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত