দেশের শিল্প খাতের প্রায় ৯০ ভাগই সিএমএসএমই বা কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, এবং মাঝারি উদ্যোগ। যেখানে প্রায় ১১ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১৮ লাখ লোক কর্মরত আছে। জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) এখাতের অবদান ২৮ শতাংশ। তবে প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা না পাওয়া, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা, অপ্রতুল অবকাঠামো, দক্ষতার স্বল্পতা, নীতি সহায়তা না পাওয়ার পাশাপাশি কঠিন শর্তাবলি, স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারে অভিগম্যতার সীমাবদ্ধতা এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকার কারণে উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল সোমবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘সিএমএসএমই খাতের ব্র্যান্ডিং ও বিপণন চ্যালেঞ্জ : রপ্তানির সম্ভাবনা’ বিষয়ক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় তারা এমন মত দিয়েছেন। মতিঝিল ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, সম্প্রতি আমাদের রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত মার্কিন শুল্কারোপের কারণে বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে খরচ বৃদ্ধি পাবে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের জরুরি ভিত্তিতে ব্যয় হ্রাসে উদ্ভাবন ও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এসএমইরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণ সহায়তা না পাওয়া, অপ্রতুল অবকাঠামো, দক্ষতার স্বল্পতা, নীতি সহায়তা না পাওয়ার পাশাপাশি কঠিন শর্তাবলি, বাজারে অভিগম্যতার সীমাবদ্ধতা এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। এ ছাড়া পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জটিলতা, পণ্য মূল্যের উচ্চ হার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দক্ষতার অভাব প্রভৃতি বিষয়গুলো আমাদের উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
এসএমইদের উন্নয়নে পণ্যের সনদ ও কমপ্লায়েন্স সহযোগিতা প্রদান, টেকসই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান, পণ্যের মান উন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা ও ক্লাস্টার উন্নয়ন, সমন্বিত নীতি সহায়তা, সিএমএসএমই ডেটাবেইস তৈরি, বেকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের সম্প্রসারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তা উন্নয়নে সার্বিক সহায়তার আহ্বান জানান তাসীকন আহমেদ।
শিল্প সচিব বলেন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং আমাদের সিএমএসএমইদের জন্য অতবী গুরুত্বপূর্ণ, সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিংও। তবে নিজেদের বৈশ্বিক ব্রান্ড না থাকায় রপ্তানি কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নীত হচ্ছে না বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা সহায়তা প্রাপ্তিতে আস্থার অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি কর্মকৌশল নির্ধারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।
তিনি জানান, ২০১৯ সালের তৈরিকৃত এসএমই নীতিমালাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এবং সেখানে নতুন নতুন ব্যবসায়িক খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করতে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানে উদ্যোক্তাদের বসবাসের ঠিকানাকে ব্যবসায়িক ঠিকানা ব্যবহারের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে যেতে পারে।
শিল্প সচিব আরও বলেন, ব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে পণ্যের মান ও মেধাস্বত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে আমাদের রপ্তানি বেশ বৃদ্ধি পাবে। এসএমই খাতের উন্নয়নে সরকারি সব সংস্থার একটি সম্মিলিত উদ্যোগ একান্ত অপরিহার্য।
বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, বিসিকের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্প পার্ক স্থাপন, স্বল্প হারে আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে এবং বিসিক শিল্প পার্কে শিল্প স্থাপনে হোল্ডিং ট্যাক্স অব্যাহতি দেওয়ার লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্যের অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়ানোর জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বৈশ্বিক বাজারে পণ্য প্রসারের জন্য দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরির পাশাপাশি দেশের জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ভোক্তারা অভিরুচি, ইচ্ছা ও আগ্রহের বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তিনি জানান, ইপিবিতে শিগগিরই রপ্তানি ইকো-সিস্টেম এবং সিএমএসএমই হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হবে, যেখানে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, যার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা নিশ্চিত হবে।
অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমইএসপিডির অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস্ ম্যানুফ্যাকচার্ড অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের উপ সচিব ড. মো. রাজ্জাকুল ইসলাম, ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন পরিচালক ও ক্রিয়েশন (প্রাইভেট) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না, বাংলাদেশ জুট ফুডসের এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম পিন্টু এবং হাত বাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাফাত কাদের অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া সভায় ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান সহ সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।