কিছু ছাত্র থাকে যাদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো করতে দেখা গেলেও বোর্ড পরীক্ষায় তাদের আশানুরূপ ফল করতে দেখা যায় না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল টি-টোয়েন্টিতে এ রকম একটা দলেই পরিণত হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে সাফল্যের হার বেশ ভালো। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, এরপর আফগানিস্তান টানা ৪টা দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সাফল্যের ছাপ নেই এশিয়া কাপের মতো বহুজাতিক টুর্নামেন্টে। ৬ ম্যাচ খেলে ৩ ম্যাচ জয় এশিয়া কাপে, পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩৬ রান তাড়া করে জেতাও সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের। তাই বলা যায়, ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ দিয়ে শুরু হলেও এই সংস্করণে বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার সামর্থ্য এখনো দেখাতে পারছে না বাংলাদেশ।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান বাজার আর খেলোয়াড়দের দেশ ছেড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলাকেই বেছে নেওয়ার মানসিকতার কারণে ক্রমশ আকর্ষণ হারাচ্ছে দ্বিপাক্ষিক টি-টোয়েন্টি সিরিজ। বেশিরভাগ সময়েই আইসিসি বা এসিসির বড় ইভেন্ট বাদে সাদা বলে অনেক দেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদেরই নিয়মিত পায় না জাতীয় দল। কেউ বেছে নেন বিশ্রাম। প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ হলে সেই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। তাই দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সাফল্য অনেক ক্ষেত্রেই ভুল বার্তা বহন করে। যেমন ২০২১ সালে বাংলাদেশ সফরে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ক্রিকেটারদের অনেকেই আসেননি, নিউজিল্যান্ড তাদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলের কাউকেই পাঠায়নি। সেই দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের মেকি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাংলাদেশ গিয়েছিল বিশ্বকাপে, সেখানে বাংলাদেশ সুপার এইট পর্বে কোনো ম্যাচই জিততে পারেনি বরং প্রথম ম্যাচেই হেরেছিল স্কটল্যান্ডের কাছে। ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ড দলও ২০২৩ এর মার্চে বেন স্টোকস, হ্যারি ব্রুক, লিয়াম লিভিংস্টোন-সহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ ক্রিকেটারকে বাদ দিয়েই দল পাঠায় বাংলাদেশে। তাদের বিপক্ষে দেশের মাটিতে ৩-০ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ, তাতে করে র্যাংকিংয়ে উন্নতি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বাজারে বাংলাদেশে ক্রিকেটারদের চাহিদা বাড়েনি। কারণ অ্যানালিস্টদের কম্পিউটারকে যে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই!
৩ বার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা (২ বার ওয়ানডে আর ১ বার টি-টোয়েন্টি সংস্করণ) আর খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে আয়োজিত একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ জেতা, এর বাইরে সাদা বলে বাংলাদেশের বড় কোনো অর্জন নেই। ২০০৩ সালে কেনিয়া খেলেছিল ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে, ২০২৪ সালে আফগানিস্তান খেলেছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। অথচ বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল, সেটাও বৃষ্টিতে পাওয়া পয়েন্টের কৃপায়। কোনো আসরেই ৩টির বেশি ম্যাচ জয়ের দৃষ্টান্ত নেই। আসছে বছর ভারত ও শ্রীলঙ্কায় হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর। যে আসরে ভালো করার জন্য লম্বা সময় ধরেই প্রস্তুতি চলছে বাংলাদেশের। লিটন দাসকে করা হয়েছে অধিনায়ক। গড়ে তোলা হয়েছে তারুণ্য নির্ভর দল। তাদের হাত ধরে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সাফল্য এলেও বড় মঞ্চে নি®প্রভ হয়ে থাকার পুরনো রোগ সারেনি। বরং পূর্বসূরিদের কাছ থেকে বেশ কিছু সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন এই সময়ের ক্রিকেটাররা। যার প্রধানতমটি হচ্ছে তীরে এসে তরী ডোবানোর লক্ষণ।
এশিয়া কাপে ভার্চুয়াল সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০ ওভারে ১৩৬ রান করতে পারেনি বাংলাদেশ। আফগানদের বিপক্ষে চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচে ১৫২ রান তাড়ায় উদ্বোধনী জুটিতে ১০৯ রান আসার পরও ৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে হারের শঙ্কা জাগিয়েছিল জাকের আলী অনিকের দল। পরের ম্যাচেও ১৪৭ রান তাড়া করতে গিয়ে টপ অর্ডারের ব্যর্থতার পর মিডল অর্ডারে কোনো জুটি দাঁড়ায়নি। ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান শরীফুল ইসলাম ৬ বলে ১১ রান না করলে ম্যাচটা জেতা হয় না বাংলাদেশের। তবে সিরিজ যেহেতু জেতা হয়েই গেছে, ফিল সিমন্সের আর মুখ খুলতে বাধা কোথায়? ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে সিমন্স বলেছেন, ‘আমরা উত্তেজনাপূর্ণ আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে চাই আর সেটাই খেলছি। আমরা স্পিনারদের ভালো খেলেছি, অন্তত আজ (শুক্রবার)। এটাই তাদের (আফগানিস্তান) শক্তি, এই কাজটা আমরা সবসময় ভালো করি না। তবে আজ আমরা ওদের স্পিনারদের অনেক ভালোভাবে সামলেছি। নুরুল (হাসান সোহান) খুব ভালো একটা ইনিংস খেলেছে আর আমাদের খাদের কিনারা থেকে নিয়ে এসেছে। জাকের আর শামীমও ভালো খেলতে শুরু করেছিল। নুরুল ম্যাচটা শেষ করে এসেছে, এটাই আমি ব্যাটসম্যানদের বোঝাতে চাচ্ছিলাম।’
সিমন্সের কথাতেই লুকিয়ে আছে সমস্যা। বাংলাদেশ দলে লম্বা সময় পরে নেদারল্যান্ডস সিরিজ ও এশিয়া কাপ দিয়েই সোহানের ফেরা। তার আগে ‘ফিনিশার রোল’ বা ম্যাচ শেষ করে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শামীম হোসেন পাটোয়ারী ও জাকের আলী অনিককে। তারা দুজন লাগাতার নিজেদের দায়িত্বে ফেল করে আসছেন। টপ অর্ডার ফেল করলে ইনিংসের শুরুর দিকেই এই দুজনকে চলে আসতে হয় উইকেটে। জাকের তো শুক্রবার ৮৬ বল পর সবশেষ ম্যাচে ছক্কা মারলেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে। গোটা এশিয়া কাপ ও আফগানদের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ এই নিয়ে ৭ ইনিংসে ছক্কাই মারতে পারেননি বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ‘পাওয়ার হিটার’।
বোলাররা সাফল্য পাচ্ছেন কমবেশি। তবে কার্যকর পঞ্চম বোলারের অভাব এখনো ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকে। বড় প্রতিপক্ষের সামনে যা বেশ খরুচে প্রমাণ হয়েছে। ব্যাটিংয়ে মিডল অর্ডার বলে কিছু নেই। মাঝের ওভারগুলোতে ইনিংসটা ধরে রাখার মতো ব্যাটসম্যান নেই, ওদিকে নামমাত্র ফিনিশারের ছড়াছড়ি। রিপোর্ট কার্ডে তাই টানা ৪ টি-টোয়েন্টি সিরিজসহ সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর মোট ৫ টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব পেশ করে উন্নতির দাবি করতে পারেন সিমন্স, তবে আদতে বাংলাদেশ দল আটকে আছে একটা জায়গাতেই।
আগে কিছুটা বিরতি, এর পর কোচিংয়ে দেখা যাবে বুসকেটসকে
বিশ্বকাপের গ্রুপ থেকেই বিদায় ব্রাজিলের, সেরা হয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা