সার উৎপাদনে গ্যাসের দাম ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:২৯ পিএম

সার কারখানায় প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার যে প্রস্তাব বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোারেশন (পেট্রোবাংলা) দিয়েছে তার তীব্র বিরোধীতা করেছে ভোক্তারা। আর বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরশেন (বিসিআইসি) বলেছে ভর্তুকি চূড়ান্ত না করে গ্যাসের দাম বাড়লে সমস্যা বাড়বে। অতীতে সরবরাহ বৃদ্ধির কথা বলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও সংকট আরও বেড়েছে।

ভর্তুকি কমাতে সার কারখানায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর সোমবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশনে দিনব্যাপী গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে আইন লঙ্ঘন করে বিইআরসি একের পর এক ভোক্তাবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তুলে গণশুনানি বর্জন করেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানিতে দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তাদের পক্ষে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করে আসছে সংগঠনটি।

বিইআরসি জানিয়েছে, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর কারো কোনও মতামত থাকলে তা ১৩ অক্টোবরের মধ্যে লিখিতভাবে কমিশনকে জানানো যাবে। পরবর্তীতে আবেদকারীদের প্রস্তাব, কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, গণশুনানিতে উপস্থাপিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামতসহ সার্বিক বিষয়ে বিচেনা করে আইন অনুযায়ী গ্যাসের মূল্যহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, গ্যাসের দাম প্রশ্নে সবদিক বিবেচনা করে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে। দাম বেড়ে গেলে সারের উৎপাদন খরচের বিষয়ে আপনারা চিন্তিত। অবশ্যই কৃষিকে বিবেচনায় নিতে হবে। জিডিপিতে কৃষির অবদান কম হলেও খাদ্যের নিরাপত্তা এবং বিশাল কর্মসংস্থানের বিষয়টি অবশ্যই ভাবনার রাখতে হবে। আবার এলএনজি আমদানির খরচের বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। কমিশন সব যুক্তির যথার্থতা যাচাই করে আদেশ চূড়ান্ত করবে।

পেট্রোবাংলার মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দাম বাড়ানো হলে বাড়তি ৭ কার্গো এলএনজি আমদানি করে সারে সরবরাহ করা হবে। ৬ মাস (অক্টোবর-মার্চ) পুরোমাত্রায় (২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হবে। অবশিষ্ট ৬ মাসের মধ্যে এপ্রিল-মে ১৬৫ মিলিয়ন হারে, জুনে ১৭৫ মিলিয়ন এবং জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৩০ মিলিয়ন হারে গ্যাস সরবরাহ দেবে। শনিবার (৩ অক্টোবর) সার উৎপাদনে ৯২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে।

তবে বিসিআইসির পরিচালক (পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন) দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলে ৪.৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়, কিন্তু নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যায়নি, বরং অনেকখানি কমেছে সরবরাহ। তবে যদি পুরোমাত্রায় গ্যাস দেওয়া হয় তাহলে ২০ লাখ টনের ওপরে সার উৎপাদন করা সম্ভব। আর ২০ লাখ টন সার উৎপাদন করা গেলে গ্যাসের ৩০ টাকা হলেও আমদানির তুলনায় কম দাম পড়বে।

তিনি বলেন, গ্যাসের দাম যদি ৩০ টাকা হয়, আর যদি ২০ লাখ টন উৎপাদন করতে পারি, তাহলে কেজি প্রতি সারের উৎপাদন খরচ পড়বে ৪৬ টাকার মতো। সেখানে আমদানিতে ৬১ টাকার মতো ব্যয় হচ্ছে।

‘ট্রেড গ্যাপ (ভর্তুকি) সুরাহা না করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সার কারখানাগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়বে। গ্যাস বিল পরিশোধে বিলম্বসহ সারের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে। গ্যাসের মিশ্রিত দর ২৮ টাকার নীচে হওয়ার উচিত,’ যোগ করেন দেলোয়ার।

দাম বাড়ানোর তীব্র বিরোধীতা করে শুনানিতে ভোক্তারা বলেন, এতে সারের উৎপাদন খরচ বাড়বে। সারের দাম বাড়লে কৃষিতে চাপ পড়বে। কৃষি উৎপাদন ব্যহত হতে পারে।

এদিকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তা স্বার্থ ও অধিকার বিপন্ন করছে বিইআরসি-এমন অভিযোগ তুলে আগে থেকেই এই শুনানি বর্জনের ডাক দিয়েছিল ক্যাব। বিভিন্ন অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরে বিইআরসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণের দাবিতে গত ৩১ জুলাই রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি। অভিযোগ নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনও গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করবে না বলে জানিয়েছে ক্যাব।

বিসিআইসি’র তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৩৮ টাকার মতো। বিসিআইসি ডিলারের কাছে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করে, আর ডিলার বিক্রি করেন ২৭ টাকা দরে। ট্রেড গ্যাপ (উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্যে ঘাটতি) ১৩ টাকা ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করছে সরকার। গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে সারের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে।

প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পরও সরবরাহ না বেড়ে বরং কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বরা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাসের অভাবে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি ৩৬১ দিন, চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি ২৭৩দিন এবং ঘোড়াশাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ১৯৮ দিন বন্ধ ছিল। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি মাত্র ৩.৭৫ শতাংশ সময় উৎপাদনে ছিল।

বিসিআইসি বলছে, বছরে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন ইউরিয়া সার যোগান দিতে হয়। গ্যাসের অভাবে আমদানি করে ১৬ থেকে ২১ লাখ টন যোগান দিতে হয়। গ্যাস অভাবে বন্ধ থাকায় কারখানাগুলো কুলিং টাওয়ার, ইলেকট্রিক্যাল বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। যার কারণে অপরেশনাল খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মনিরুজ্জামান বলেন, সারের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কোন প্রস্তাবনা নেই। সে কারণে কৃষকের উপর কোন চাপ পড়বে না। তবে সারের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে সেই ঘাটতির পুরনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া দরকার।

শুনানিতে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান, পরিচালক (অপরেশন) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, জেনারেল ম্যানেজার মেহেরুল ইসলাম, তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ, কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ফজলে আলম, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা রেজাবুদ্দৌলা, সাংবাদিক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, লুৎফর রহমান কাকন প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত