শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণ কল্পনা সম্ভব নয়। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামি আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা মুজাদালা ১১)
ইসলাম শিক্ষা শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম হলো, একজন মানুষের সকাল থেকে সন্ধ্যা কিংবা জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালনা করার একটা পূর্ণাঙ্গ রুটিন। যে রুটিন মেনে চললে একজন মানুষ আল্লাহভীরু, সৎ, দয়ালু ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সক্ষম হয়। ইসলামি শিক্ষা একজন মানুষের চরিত্র গঠন, নৈতিকতা অর্জন এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা হলো আত্মিক, নৈতিক ও জ্ঞানগত পরিপূর্ণতার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে একজন মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয় এবং নিজের জীবনে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে শিখে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, ‘শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে একজন মানুষের চরিত্র গঠন এবং আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলা।’
এই প্রক্রিয়াটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত ও ইচ্ছাশক্তির বিকাশ ঘটায়। ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ, আল্লাহভীরু ও দায়িত্বশীল মানুষ গঠন করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্যে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেন। যদিও তারা ছিল স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত।’ (সুরা জুমুআ ২)
বহু যুগ ধরে আমাদের শত্রুরা বাহ্যিকভাবে আমাদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা একটি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আমাদের ইমান, আত্মিক শক্তি ও চিন্তা-চেতনায় দুর্বলতা সৃষ্টি করার জন্য। কথায় আছে, ‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে আগে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দাও।’ এই নীতিতে তারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন এনেছে, যা ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে বিজাতীয় চিন্তা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ ঢুকিয়ে দিয়েছে। আজ আমরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে ইসলামি আদর্শ, আত্মত্যাগ, সাহস ও তাকওয়া থেকে আমরা অনেকটাই বিচ্যুত। আমাদের চেতনায় সেই ইমানি দৃঢ়তা অনুপস্থিত, যা ছিল মুহাম্মদ আল-ফাতিহ (রহ.)-এর মতো মনীষীর মধ্যে, যিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে ইস্তানবুল বিজয়ের জন্য রওনা হয়েছিলেন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘এই উম্মতের পূর্ববর্তীরা যেভাবে সফল হয়েছে, পরবর্তীরাও শুধুমাত্র সেই পথ অনুসরণ করলেই সফল হতে পারবে।’
আজকের সমাজে আমরা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, পক্ষপাতিত্ব, ব্যবসায়িক অস্থিরতা, শোষণ ও অবৈধ আয়ের বিস্তার দেখে চরম অস্থিরতা অনুভব করছি। এই সমস্যাগুলো শুধুমাত্র আইন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়, কারণ এর মূল শেকড় নিহিত আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের চারিত্রিক দুর্বলতায়। নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি এবং জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীনতাই আমাদের এই নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ ইসলামি আদর্শ আমাদের শিক্ষা দেয়, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, সহনশীলতা, ইনসাফ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ত্যাগের মহিমা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন নিষেধ করেন।’ (সুরা নাহল ৯০)
লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
