দেশ রূপান্তর এক্সপ্লেইনার

স্টারমারের সফরের মধ্যেই তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে, কী বার্তা দিচ্ছে

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৫২ পিএম

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসীদের তালিকায় থাকা আফগানিস্তানের তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ৮ দিনের জন্য ভারত সফরে এসেছেন। তিনি এমন এক সময় ভারতে এসেছেন যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও দিল্লিতে।

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন আমির খান মুত্তাকি। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখেও তার ভারত সফরের জন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষ ছাড়ের। তাহলে তিনি কী করে অনুমতি পেলেন? জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কমিটি আমির খান মুত্তাকিকে এই সফরের অনুমতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম ভারত সফরে কিয়ার স্টারমার। বৃহস্পতিবার ভারত-যুক্তরাজ্যের মধ্যে প্রায় ৪৬ দশমকি ৮ কোটি ডলারের (৩৫ কোটি পাউন্ড) ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত জুলাই মাসেও দেশ দুটির মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের চড়া শুল্ক আরোপের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সফরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ভারত সফরে রয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও তার প্রতিনিধি দল। ছবি: রয়টার্স

ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, ইনভেস্টমেন্ট, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানসহ একাধিক বিষয়। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আমির খান মুত্তাকির প্রথম ভারত সফর। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তার বৈঠক হবে কি না সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।

আর পাকিস্তানের সঙ্গে তালিবানের সম্পর্কেরও এখন টানাপোড়েন চলছে। মোদির সঙ্গে মুত্তাকির বৈঠকের নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার বৈঠক হতে চলেছে। তবে ভারত এখনো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।

তালেবানকে নয়া দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে কি না সে বিষয়ে রণধীর জয়সওয়ালকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে স্বীকৃতি না দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে।

সম্প্রতি রাশিয়ায় আয়োজিত 'মস্কো ফরম্যাট কনসালটেন্স'-এ আফগানিস্তানের বাগরাম এয়ার বেস যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছিলেন, তার বিরোধিতা জানানো হয়। যেকটা দেশ মিলে ওই যৌথ বিবৃতি জারি করেছে, সেই তালিকায় ভারতও রয়েছে, যদিও ওই এয়ার বেসের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। এইসব বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে মুত্তাকির এই ভারত সফরের দিকে সবার নজর। দুই দেশের কী স্বার্থ রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারত ও আফগানিস্তান দুই দেশের গণমাধ্যমেই এই সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারতের দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুত্তাকিকে পূর্ণ প্রোটোকল দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মান দেওয়া হবে। তার আতিথেয়তার জন্য উপস্থিত থাকবেন সরকারি কর্মকর্তারা। হায়দরাবাদ হাউসে ১০ অক্টোবর জয়শঙ্করের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে।

মুত্তাকির এই সফর নিয়ে আফগান গণমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। পশতু ভাষার শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যম আমু টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দুটি সূত্র জানিয়েছে, তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি তাদের নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার কাছ থেকে ভারত ও রাশিয়া সফরের বিশেষ নির্দেশ পেয়েছেন। এই দুই সফরের আগে মুত্তাকিকে আখুন্দজাদা কান্দাহারে ডেকে পাঠান। তবে এই বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মুত্তাকিকে ভারত সফরের অনুমতি দিলেও রাশিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।’

মস্কো ফরম্যাটে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকি। ছবি: সংগৃহীত

‘সূত্রের খবর, গত সপ্তাহের শুক্রবার কান্দাহারে আখুন্দজাদার সঙ্গে দেখা করেন মুত্তাকি। আখুন্দজাদা কান্দাহারে বাস করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। ভারত সফর এমন সময়ে হচ্ছে যখন সাম্প্রতিক মাসগুলোয় মুত্তাকির পাকিস্তান সফরের বেশ কয়েকটি পরিকল্পিত বাতিল করা হয়েছে। আখুন্দজাদার আপত্তির কারণে বা যৌক্তিক কারণেই এমনটা ঘটেছে।’

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের পক্ষে এবং তালেবানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে খুব সতর্ক ছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের শত্রুতার কারণে তালেবানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারত।

এ বিষয়ে সচেতন অনেকেই মনে করছেন, তালেবানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্থাপনের কারণগুলোর মধ্যে প্রধান হলো পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সাম্প্রতিক সমীকরণ। অন্যদিকে, তালেবান সরকারের এজেন্ডার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে তাদের স্বীকৃতি, যা ভারত দেয়নি।

আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পর চার বছর হয়ে গেছে এবং রাশিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ যারা তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা ছাড়া কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবানকে গ্রহণ করেনি। এমনকি পাকিস্তানও তাদের স্বীকৃতি দেয়নি।

চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ আয়োজিত মস্কো ফরম্যাট কন্সাল্টেশন্স-এ দশটা দেশ অংশ নিয়েছিল। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রাশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় কুমার। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিশেষ দূত মোহাম্মদ সাদিকসহ চীন, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আফগানিস্তানের পক্ষে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকিও ছিলেন।

'মস্কো ফরম্যাট'-এর যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়, যেখানে তিনি বাগরাম বিমান ঘাঁটিকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত