দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে সংঘাত থামানোর চুক্তিতে সম্মতি জানিয়েছে হামাস এবং ইসরায়েল। এই সমঝোতা কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে কেবল গোলাগুলি বন্ধ হবে তা-ই নয়, উভয় পক্ষই একে অপরের আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেবে। চুক্তির শর্ত মেনে এরই মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভিটেমাটিছাড়া হয়ে পড়া হাজার-হাজার ফিলিস্তিনি জনতা নিজেদের ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে, গত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারবর্গ অধীর আগ্রহে ইসরায়েলে তাঁদের আপনজনদের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছে।
টানা দুই বছর ধরে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গভীর শোকে নিমজ্জিত গাজাবাসী, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর নিজেদের বাড়িতে ফেরার সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপি খান ইউনিস থেকে জানিয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আজ হাজার-হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি জনতা গাজা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।
শুরুতে কিছুটা ভীতি কাজ করলেও, প্রচুর সংখ্যক ফিলিস্তিনি গাজা সিটির পথে পা বাড়ান। মধ্য গাজার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকাগুলো থেকে তারা দলবদ্ধভাবে হেঁটে গাজা সিটির দিকে এগোচ্ছেন।
রাস্তায় হাঁটার সময় জনগণের মধ্যে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। তারা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিচ্ছেন, উল্লাস করছেন এবং অনেকে শিস বাজিয়ে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করছেন।
বাস্তুচ্যুত গাজা সিটির বাসিন্দা ইব্রাহিম আল-হেলু (৪০) নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, “আমি আবেগাপ্লুত হলেও সতর্ক ছিলাম। পরিস্থিতি বিপজ্জনক ছিল, গুলিবর্ষণ হচ্ছিল, সে কারণে আমি একটু অপেক্ষা করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিলাম।”
তিনি আরও বলেন, “রাস্তায় কোনো বাধা নেই, এখন আমরা গাজায় আমাদের বাড়ি ফিরে সেখানকার পরিস্থিতি দেখার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে রওনা দিয়েছি।”
গত বুধবার (০৮ অক্টোবর) মিশরের অবকাশযাপন কেন্দ্র শারম আল-শেখে হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। সেখানে গাজায় সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এই পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, মিশর এবং তুরস্ক এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
বুধবার রাতে দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার খবরটি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ তিনি লিখেছেন, “আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ইসরায়েল ও হামাস—দুপক্ষই সই করেছে। এর অর্থ হলো খুব শিগগির সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে। আর ইসরায়েল সমঝোতার ভিত্তিতে একটি এলাকা বরাবর সেনা প্রত্যাহার করবে। এটি শক্তিশালী, টেকসই ও চিরস্থায়ী শান্তির পথে প্রথম ধাপ।”
যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার বিষয়টি হামাসের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়। তারা জানায়, তারা এমন একটি চুক্তিতে উপনীত হয়েছে, যা গাজায় চলমান সংঘাতের সমাপ্তি ঘটাবে। একইসঙ্গে এই চুক্তির ফলে উপত্যকাটি থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের পথ তৈরি হবে, মানবিক সাহায্য প্রবেশাধিকার পাবে এবং বন্দিবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
পরবর্তীতে হামাসের আলোচক দলের প্রধান খলিল আল-হায়া নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো নিশ্চয়তা দিয়েছে যে “যুদ্ধ” পুরোপুরি শেষ হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় টানা ভয়াবহ বর্বরতা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এসময়ের মধ্যে কেবল দুই দফায় মাত্র দুই মাসের সামান্য কিছু বেশি সময় যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। বাকি পুরোটা সময় ধরে একের পর এক হামলায় ইসরায়েল ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে আহত করেছে।
