শান্ত সুনিবিড় ছায়া ঘেরা আঁকাবাকা সড়কের পাহাড়ি ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখলে মনে হবে যেন চিত্রপটে আঁকা কোনও ছবি। পাহাড়, ঝর্ণা, ফসলি মাঠ, বিচিত্র বৃক্ষরাজি আর গ্রামীণ আবহ সব মিলিয়ে চমৎকার পরিবেশ।
এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাইরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি পরিচয় রয়েছে সেটা হলো সবচাইতে বেশি সংঘাতের ক্যাম্পাস। কেউ কেউ তো বলে থাকেন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় ভারতের মেঘালয়ে আর সবচেয়ে বেশি মারামারি হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত কয়েক দশক ধরে এই সংঘাতের সিলসিলা বহন করে চলেছে এই ক্যাম্পাস। কখনও ইসলামী ছাত্র শিবির আবার কখনও ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ) পালাক্রমে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে চবি ক্যাম্পাসে।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা আশার আলো খুঁজছেন। ৩৬ বছর পর হচ্ছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। নতুন দিনের শুরু হবে নাকি পুরোনো সেই খুনোখুনির পরিবেশ ফিরবে তা বলা যাবে আগামী ১৫ তারিখ ভোটের পর।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকই হয়তো জানেন না সংঘর্ষ, হত্যা ও ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস। এখানে ছাত্ররাজনীতি মূলত ছাত্রলীগে (নিষিদ্ধ) ও শিবিরের আধিপত্য বিস্তারের কালচক্রে আবদ্ধ। ১৯৮৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রশিবির দুই দশক এবং ছাত্রলীগ প্রায় দেড় দশক একক আধিপত্য বিস্তার করেছে ক্যাম্পাসে। এই সময় ছাত্ররাজনীতির নামে আধিপত্য ধরে রাখার উন্মাদ খেলায় খুন হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ জন মেধাবী শিক্ষার্থী।
ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে জাতীয় ছাত্রসমাজ নেতা হামিদের হাতের কব্জি কেটে ক্যাম্পাসে সহিংসতা শুরু করে ছাত্রশিবির। কাটা কব্জি নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে মিছিলও করেছিল তারা। এরপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও ধরে রাখতে একের পর হত্যাকাণ্ডে নাম আসে শিবিরের। ১৯৯০ সালে সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মাত্র একটি হলে শিবির নির্বাচিত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর ক্রমান্বয়ে সব হল দখল করে নেয় শিবির। এরপর ২০০৯ পর্যন্ত সরকার বদল হলেও ক্যাম্পাসে শিবির আধিপত্যের পরিবর্তন হয়নি।
১৯৮৮ সালে চবিতে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সে বছর ২৮ এপ্রিল নগরীর বটতলী স্টেশনে শিবিরের সঙ্গে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সংঘর্ষে গোলাগুলিতে পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমিনুল হক প্রাণ হারান। ১৯৯০ সালের ২৪ ডিসেম্বর শিবিরের হামলায় ছাত্রমৈত্রীর কর্মী ফারুকউজ্জামান নিহত হন। ১৯৯৪ সালের ২৯ অক্টোবর শিবির কর্মীদের হাতে নিহত হন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল হুদা মুছা। ১৯৯৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত একটি কটেজে (মেস) হামলা চালিয়ে আবৃত্তিকার বকুলকে ছাত্রলীগ কর্মী সন্দেহে হত্যা করেন শিবির কর্মীরা। ১৯৯৮ সালের ৬ মে শাহ আমানত দখল নিতে হামলা করে শিবির। হামলায় বরিশাল থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা আইয়ুব নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন। ১৯৯৮ সালের ১৮ মে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের বালুছড়া এলাকায় একটি শিক্ষক বাসে গুলি ছোড়ে শিবির কর্মীরা। গুলিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মুশফিক-উস-সালেহীন প্রাণ হারান। ১৯৯৮ সালের ২১ আগস্ট শিবির-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সঞ্জয় তলাপাত্র নিহত হন। এরপর ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফতেয়াবাদ এলাকায় ছাত্রশিবিরের ব্রাশফায়ারে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ নেতা আলী মর্তুজা।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেও ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ থাকে শিবিরের হাতে। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ হারায় শিবির। এরপর শুরু হয় ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি হল দখল করে ছাত্রলীগ। ওই সময় পৃথক দুই ঘটনায় নিহত হন শিবিরের ৩ নেতা। এর আগে ১৯৮৮ সালে আইনুল হক নামে শিবিরের এক কর্মীকে হত্যা করে লাশ গুম করার অভিযোগে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে শিবির। ১৯৯৮ সালের ২৪ মে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিজ গুলিতে প্রাণ হারান ছাত্রলীগ কর্মী ও পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের ছাত্র সাইফুর রহমান। ১৯৯৯ সালের ১৫ মে ছাত্রশিবির কর্মী জোবায়েরকে বন ও পরিবেশবিদ্যা ছাত্রাবাসের পেছনে নিয়ে গুলি করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। একই বছর ১৯ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী হলে হামলা চালিয়ে মাহমুদুল হাসান ও মো. রহিমুদ্দিন নামে ছাত্রশিবিরের দুই কর্মীকে হত্যা করে ছাত্রলীগ । ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষে প্রাণ হারান শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হল শাখার সাধারণ সম্পাদক মাসুদ বিন হাবিব ও জীববিজ্ঞান অনুষদের প্রচার সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি ছাত্রলীগ-শিবিরের সংঘর্ষে প্রাণ হারান শাহ আমানত হলের সাধারণ সম্পাদক ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মামুন হোসেন।
গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ছিল। এ সময় ছাত্রী হেনস্তা থেকে চাঁদাবাজি সবকিছুতে তাদের নাম আসে। দলীয় কোন্দলে অসংখ্য বার রণক্ষেত্র হয়েছে ক্যাম্পাস। ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী, সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী তাপস সরকার। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ। এই ঘটনায় ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে আসামি করে হত্যা মামলা করে দিয়াজের পরিবার। এছাড়া শিবির সন্দেহে ছাত্রলীগের নির্যাতনে অসংখ্য শিক্ষার্থীর অঙ্গহানী হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো থেকে সহজেই অনুমান করা যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির নামে আসলে কি চলেছে! জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে ছাত্ররাজনীতির নামে ওই কালো অধ্যায়ে কেউ ঢুকতে চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কি পারবে সেই সঠিক নেত্রত্ব বাছাই করতে? নাকি ছাত্ররাজনীতির আড়ালে কোনও আধিপত্যবাদী শক্তিকে ক্ষমতায়ন করবে? আগামী ১৫ তারিখ শিক্ষার্থীদের রায়ের ওপর নির্ভর করবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী ও সংবাদিক
