আধুনিক বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এমন বহু শক্তিশালী নেতা আছেন, যাদের ক্ষমতার শিখর থেকে নামতে হয়েছে জনগণের বিক্ষোভ, সামরিক বিদ্রোহ কিংবা রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে। কেউ প্রাণরক্ষার তাগিদে, কেউ কারাবাস বা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কায় রাতারাতি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সম্প্রতি মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা সেই দীর্ঘ তালিকার সর্বশেষ নাম। তরুণদের নেতৃত্বে টানা বিক্ষোভ ও সেনা অভ্যুত্থানের পর তিনি ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে গেছেন নির্বাসনে।
এই প্রতিবেদনে আলোচনায় থাকছে এমন আটজন প্রভাবশালী নেতা, যাদের পতন ঘটেছে গণঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে-
শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়কার দমনপীড়নে অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। দুই দশকব্যাপী তার শাসনের অবসান ঘটে আকস্মিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে।
বাশার আল-আসাদ
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদও ২০২৪ সালে একই পরিণতির শিকার হন। বিদ্রোহীদের চাপ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আল-আসাদ পরিবারের টানা ৫১ বছরের শাসন। তেহরান ও মস্কোর সমর্থনে ১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হয় মস্কোতে।
গোতাবায়া রাজাপাকসে
২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে শ্রীলঙ্কাজুড়ে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনগণ প্রেসিডেন্ট ভবন দখল করলে গোতাবায়া রাজাপাকসে মালদ্বীপে পালিয়ে যান। পরে তিনিসহ তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগ করেন। রাজাপাকসে পরিবারের পতন ঘটে খাদ্য সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও দুর্নীতির দায়ে।
ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ
২০১৪ সালে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সহিংস বিক্ষোভের পর প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে রাশিয়ার কাছ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তার বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেয়। পার্লামেন্ট তাকে অভিশংসন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ধারণা করা হয়, রুশ সেনাদের সহায়তায় তিনি ক্রিমিয়ার পথ ধরে রাশিয়ায় পালিয়ে যান।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি
২০১১ সালের আরব বসন্ত লিবিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ডেকে আনে। রাজধানী ত্রিপোলি বিদ্রোহীদের দখলে গেলে তিনি নিজ শহর সির্তে আত্মগোপনে যান। ওই বছরের ২০ অক্টোবর ন্যাটোর বিমান হামলায় তার গাড়িবহর আক্রান্ত হলে বিদ্রোহীরা তাকে হত্যা করে। পরে তার মরদেহ প্রকাশ্যে প্রদর্শনের পর মরুভূমির এক অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়।
মার্ক রাভালোমানানা
২০০৯ সালে মাদাগাস্কারের তৎকালীন মেয়র আন্দ্রি রাজোয়েলিনার নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট মার্ক রাভালোমানানাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যান। অনুপস্থিত অবস্থায় আদালত তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়। পাঁচ বছর নির্বাসনে থেকে ২০১৫ সালে দেশে ফিরে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান।
জ্যঁ-বের্ত্রঁ আরিস্তিদ
হাইতির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জ্যঁ-বের্ত্রঁ আরিস্তিদ ১৯৯১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত হয়ে দেশ ছাড়েন। তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু ২০০৪ সালে ফের বিদ্রোহ দেখা দিলে মার্কিন সেনাদের সহযোগিতায় তাকে সরিয়ে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয় নেওয়ার পর ২০১১ সালে তিনি আবার হাইতিতে ফিরে আসেন।
আন্দ্রি রাজোয়েলিনা
২০০৯ সালে যে আন্দ্রি রাজোয়েলিনা রাভালোমানানার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন, ২০২৫ সালে তাকেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হলো একই নাটকের পুনরাবৃত্তিতে। পানির সংকট, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হয় আন্দোলন। সেনাবাহিনী সমর্থন তুলে নিলে শেষ পর্যন্ত তিনিও দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এই নেতাদের পরিণতি বিশ্বরাজনীতির এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে—ক্ষমতার স্থায়িত্ব কখনোই নিশ্চিত নয়। জনগণের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি কিংবা দমননীতি—যে কোনো একটি কারণই মুহূর্তে বদলে দিতে পারে ভাগ্যের দিকচিত্র। মাদাগাস্কারের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান সেই পুরোনো বাস্তবতারই নতুন সংস্করণ, যেখানে ইতিহাস যেন নিজেকেই বারবার পুনরাবৃত্তি করছে।
সূত্র: এপি
