দুর্দান্ত ফর্মে আছেন ব্রাজিল তারকা রাফিনহা। তার যাত্রা শুরু হয়েছিল রেস্তিঙ্গা থেকে—পোর্তো আলেগ্রের এক শ্রমজীবী পাড়া থেকে। এরপর পেশাগত এবং ব্যক্তিগত কারণে তাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে হলেও শেকড়কে ভুলে যাননি। তার আশ্রয়স্থল রয়ে গেছে সাম্বাই। ফুটবলের সঙ্গে আছে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগও। ইএসপিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাফিনহা বলেছেন- ‘আমি সাম্বার মাঝেই জন্মেছি, সাম্বার মাঝেই বড় হয়েছি।’ দেশ রূপান্তর-এর পাঠকদের জন্য রইল সেই সাক্ষাৎকার।
তোমার ইনস্টাগ্রাম বায়োর লিঙ্কটা তোমার প্লেলিস্ট। ‘আলমা বোয়েমিয়া’ শিরোনামের গানটিতে একটা লাইন আছে—‘ভালোবাসা, যদি কখনো আমি পাগল হয়ে যাই, মাফ করে দিও।’ রাফিনহা কেমন হয় যখন ‘পাগল’ হয়ে যায়?
রাফিনহা: ভালো হয় যদি তখন কেউ আশেপাশে না থাকে। মাঝেমধ্যে আমি খুব দ্রুত রেগে যাই। যদিও নিজের উপর অনেক নিয়ন্ত্রণ রাখি, কিন্তু যখন কোনোকিছু আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আমার প্রতিক্রিয়াটা একটু বেশিই হয়।
এটা বেশি ঘটে মাঠে, না মাঠের বাইরে?
রাফিনহা: এখন আর আগের মতো হয় না। আগের দিনে মাঠে অনেক বেশি হতো। এখন মাঠে আমি অনেক বেশি মনোযোগী এবং সংযত হয়ে থাকি। আগে মাঠে মাথা ঠাণ্ডা রাখা কঠিন ছিল। এখন আমি অনেক বেশি পরিণত।
‘আলমা বোয়েমিয়া’ -তে আরেকটা লাইন আছে, ‘আমার মিষ্টি সঙ্গিনী’। আমি মনে করি, তোমার বিয়ের আগে এক রাফিনহা ছিল, আর বিয়ের পরে আরেকজন। তোমার স্ত্রী নাটালিয়া কি সত্যিই তোমাকে এতটা বদলে দিয়েছে?
রাফিনহা: সে আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমাকে ভালো মানুষ বানিয়েছে, ভালো খেলোয়াড় বানিয়েছে। সে আমাকে শিখিয়েছে আমি কতটা মূল্যবান, আমি কী পারি, কোথায় পৌঁছাতে পারি। মাঝে মাঝে সে আমার উপর আমার চেয়ে বেশি বিশ্বাস রাখে। আমি আজ যে মানুষ, তার বড় কৃতিত্ব তার।
আরেকটা লাইন আছে: ‘মোরো দোস প্রাজারেস, যা তুমি আমাকে দাও।’ তোমার নিজের ‘মোরো দোস প্রাজারেস’ (আনন্দের পাহাড়) কোনটা?
রাফিনহা: রেস্তিঙ্গা—আমার পাড়া, আমার সবকিছু। যেখানে আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি। আমার শৈশব, বন্ধুত্ব, রাস্তাঘাট, মাঠ—সবই রেস্তিঙ্গার। আমি সবসময় আমার শিকড় মনে রাখি। ওখানেই আমি আমার সব মূল্যবোধ শিখেছি।
তুমি বলেছো, তুমি ‘সাম্বার ভেতরেই বড় হয়েছো। এটা সত্যি?
রাফিনহা: অবশ্যই। অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ানই সঙ্গীত ছাড়া থাকতে পারে না। আমি নিজে সাম্বা, ফাঙ্ক আর পাগোদের পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার বাবাও একজন সংগীতশিল্পী। তাই সঙ্গীত আমার জীবনের অংশ হওয়া স্বাভাবিক।
তুমি নিজে কি সাম্বায় পারফর্ম কর?
রাফিনহা: (হাসি) ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি পারকাশন বাজিয়ে সাহায্য করি।
তুমি কি নিজেকে অনুপ্রেরণার উদাহরণ ভাবো?
রাফিনহা: আমাদের মতো যারা সবসময় মিডিয়ায় থাকে, তাদের বুঝতে হবে যে আমাদের অন্যদের জীবনে প্রভাব রয়েছে। যেমন আমার ছোটবেলায় আমারও আইডল ছিল, এখন হয়তো অনেক বাচ্চার কাছে আমি আইডল। এটা আমাকে প্রতিদিন আরও ভালো মানুষ, ভালো পেশাদার হতে অনুপ্রাণিত করে।
ব্যালন ডি’অরের পর তুমি কি আরও গভীরভাবে সঙ্গীতে ডুবে গিয়েছিলে?
রাফিনহা: হ্যাঁ, সঙ্গীত আমার আশ্রয়। আমি মনোযোগ দিতে, আনন্দ পেতে, বা মানসিক চাপ সামলাতে—সব কিছুতেই সঙ্গীত ব্যবহার করি। ব্যালন ডি’অর নিয়ে আমি গর্বিত। আমি আমার সেরাটা দিয়েছি। পঞ্চম হওয়াও গর্বের। পরিবারের সুখই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
তুমি কি মনে করো, তুমি সেরা তিনে থাকা উচিত ছিল?
রাফিনহা: হ্যাঁ।
তোমার স্ত্রী নাটালিয়া তখন লিখেছিলেন, ‘এই মৌসুমে কখনও পথ হারাবে না।’ এটা কি কিছু বোঝাতে চেয়েছিল?
রাফিনহা: ও যা লিখেছিল, সেটা তখন তার অনুভূতি ছিল। আমার ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম ছিল এটা।
তোমার ক্যারিয়ার ধাপে ধাপে এগিয়েছে—আভাই, গিমারাইন্স, স্পোর্টিং, রেন, লিডস, বার্সা... এটা কি তোমাকে সাহায্য করেছে?
রাফিনহা: অবশ্যই। ধাপে ধাপে এগোনো আমাকে মাঠে ও জীবনে অনেক কিছু শিখিয়েছে। শুরুতেই বড় দলে গেলে হয়তো আমি এতটা শিখতাম না।
সবচেয়ে বড় জয় কী?
রাফিনহা: আমার পরিবার। তারা আমার অনুপ্রেরণা। তারা ভালো না থাকলে আমিও পারফর্ম করতে পারি না।
তুমি জর্জ জেসুসের জন্য স্পোর্টিংয়ে গিয়েছিলে, কিন্তু তিনি তখন চলে যান... আফসোস হয়েছিল?
রাফিনহা: হ্যাঁ, একটু হয়েছিল। তিনি দারুণ কোচ, তার সঙ্গে কাজ করতে পারলে ভালো লাগত।
বিয়েলসা (লিডসে) তোমার উপর কতটা প্রভাব ফেলেছিলেন?
রাফিনহা: তিনি আমাকে প্রিমিয়ার লিগে পৌঁছে দিয়েছেন—এটা ছিল আমার স্বপ্ন। তিনি আমাকে আরও ভালো খেলোয়াড় বানিয়েছেন, বিশেষ করে ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে।
ভবিষ্যতে তোমার বার্সেলোনা অধ্যায়টা কেমন হবে?
রাফিনহা: এটা হবে স্বপ্নপূরণের অধ্যায়। ছোটবেলা থেকেই বার্সার ভক্ত ছিলাম, রোনালদিনহো ও নেইমারের কারণে। এই জার্সি পরা আমার গর্ব।
তুমি অনেক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলে বার্সার জন্য, তাই না?
রাফিনহা: হ্যাঁ। ম্যানইউ, আর্সেনাল, চেলসি, বায়ার্ন, টটেনহ্যাম—অনেকে চেয়েছিল। কিন্তু আমি সবসময় বলেছি, আমার স্বপ্ন আগে।
সময় যন্ত্র থাকলে, তুমি কাকে বেছে নিতে—রোনালদিনহো না মেসি?
রাফিনহা: রোনালদিনহো। তিনি আমার প্রথম অনুপ্রেরণা, এখন বন্ধু। যদি পারতাম, তার সঙ্গে আবার খেলতাম।
তুমি বলেছো, ক্যারিয়ার শেষ করতে চাও বার্সেলোনায়। যদি না পারো, ব্রাজিলে খেলবে?
রাফিনহা: হ্যাঁ, ব্রাজিলের সিরি আ-তে খেলতে চাই। তবে কোন ক্লাবে শেষ করব, সেটা সময় বলবে।
তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে লা লিগা জেতার পর হাঁটু গেড়ে মাঠ পার হবে—বিশ্বকাপ জিতলে কী করবে?
রাফিনহা: তখনও তাই করব—মাঠের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে যাব।
বিশ্বকাপ নিয়ে কি রাতে অনেক কিছু ভাব?
রাফিনহা: প্রতিদিন। যদি তুমি দেশের জন্য খেল আর বিশ্বকাপ না ভাব, তাহলে সেই জার্সি পরার মানে নেই।
আনচেলত্তির সঙ্গে তোমার প্রথম দেখা কেমন ছিল?
রাফিনহা: খুব ভালো। আমরা সবসময় মাঠে রসিকতা করতাম। জাতীয় দলে তিনি আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছেন।
তিনি কি সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায়?
রাফিনহা: আমি তাই মনে করি—সঠিক মানুষ, সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় এসেছে।
‘ব্রাজিল আবার সুন্দর ফুটবল খেলতে পারবে’—আনচেলত্তির এই কথার মানে কী?
রাফিনহা: আমাদের সেই জাদু ফিরে আনার সামর্থ্য আছে, যাতে মানুষ আবার ব্রাজিলের জন্য গর্ব করে।
নেইমারকে ঘিরে বিতর্ক—তোমাকে কি বিরক্ত করে?
রাফিনহা: না। ফিট থাকলে নেইমারকে দলে নেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগই থাকবে না। সে মাঠে ও মাঠের বাইরে দুই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ।
নেইমার ছাড়া কি তুমি ‘দ্য গাই’ হতে পারো ব্রাজিলের জন্য?
রাফিনহা: আমাদের দলে অনেক ‘গাই’ আছে। সবচেয়ে জরুরি হলো টিমওয়ার্ক।
তোমার মতে ব্রাজিলিয়ানরা তোমাকে কেমন ভাবে? তুমি তো কখনও ব্রাজিলিয়ান লিগে খেলোনি...
রাফিনহা: অনেকে শুধু জাতীয় দলের পারফরম্যান্স দেখে বিচার করে। কিন্তু আমি জানি আমি কী পারি। আমার লক্ষ্য একটাই—ব্রাজিলিয়ানদের সুখী করা।
তুমি সাক্ষাৎকারের শুরুতে বলেছিলে, তুমি মাঝেমধ্যে উত্তেজিত হয়ে যাও। এখন বলো—যখন তুমি উল্লসিত হও, তখন কেমন কর?
রাফিনহা: এটা ব্যখ্যাতীত এক অনুভূতি। তখন আমি আমার পরিবার, বন্ধুদের সঙ্গে মুহূর্তটা উপভোগ করি। আমি নিজেকে আড়াল রাখি, একান্তভাবে আনন্দ উপভোগ করি।
শেষ কথা
রাফিনহা: আমি সাম্বার সন্তান, মাঠে আমার জীবন, পরিবার আমার শক্তি, আর বিশ্বকাপ আমার লক্ষ্য।
