কয়েকজন উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়ে ৩ দলের প্রশ্ন

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:১০ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলগুলো নির্বাচনের আগেই তাদের সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন রাজনৈতিক দলের বৈঠকে উপদেষ্টদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে। একটি দলের তালিকায় আমার নাম ও আছে। আত্মপক্ষ সমর্থনে শুধু এই টুকুই বলা যে, আমি পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তা করতে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত নই। সবসময় কোনোরূপ অনুরাগ বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, তবুও প্রশ্ন যেহেতু উঠেছে এর নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টাবৃন্দ, বিশেষ সহকারীবৃন্দ, চুক্তি ভিত্তিক নিয়োজিত সকল কর্মকর্তাদের কেউই পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের (যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন) কোনো লাভজনক পদে কেউই অংশ নিতে পারবেন না এই মর্মে একটি অধ্যাদেশ জারি করলে এ সমস্যার সুরাহা হতে পারে বলে আমি মনে করি।

এতে তিনি বলেন, তবে শর্ত থাকে যে, নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগে যারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে পদত্যাগ করবেন তাদের ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে না।

এর আগে গত মঙ্গল ও বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে দলগুলো সুনির্দিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। প্রথমে বিএনপি সুনির্দিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মঙ্গলবার। পরদিন বুধবার জামায়াতে ইসলামী প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করে কিছু উপদেষ্টার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতারাও তাদের অভিযোগ জানিয়েছেন।

বিতর্কিত উপদেষ্টা কারা, কেন দলগুলো এমন অভিযোগ তুলছে-এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা অনেক দিন ধরেই কিছু উপদেষ্টার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করে আসছেন।

বিএনপির অভিযোগ, কিছু উপদেষ্টা একটি বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করছে। বিশেষ দল বলতে তারা জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করেছে। জামায়াতও একইভাবে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে অভিযোগ করে আসছে।

বর্তমানে এনসিপির অভিযোগ বিএনপি ও জামায়াতকে টার্গেট করে। তাদের বক্তব্য- জনপ্রশাসনে বদলি-পদায়নে বড় দলগুলোর 'ভাগ-বাটোয়ারায়' উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকে সহায়তা করা হচ্ছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা গত মঙ্গলবার দেখা করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। বৈঠকে তারা কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। বিএনপির অভিযোগ, প্রশাসনে ও পুলিশে বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে কাজ করছেন ওই উপদেষ্টারা।

প্রশাসনে রদবদল বা পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন সম্পর্কিত কেবিনেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে চারজন উপদেষ্টা ও কেবিনেট বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব রয়েছেন। বিএনপি নেতারা বলেছেন, কেবিনেট কমিটি নিয়েই আপত্তি জানিয়েছেন তারা।

দলটির যে নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন, তাদের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিতর্কিত কয়েকজন উপদেষ্টার নাম তারা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন। বিএনপির সেই বিতর্কিতদের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছেন জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তিনি প্রশাসনে রদবদলের কেবিনেট কমিটিতে রয়েছেন। এই কমিটির আরেকজন সদস্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব শেখ আব্দুর রশিদের নাম উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধেও একটি বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জানিয়েছে বিএনপি।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। ওই মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার পরই তার অবস্থান। বিএনপি নেতারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে খোদা বখস চৌধুরীর বিরুদ্ধেও একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দিয়েছেন।

কোনো কোনো উপদেষ্টা রাজনীতি বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন, এই অভিযোগও বিএনপি জানিয়েছে। এই অভিযোগের ক্ষেত্রে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের থাকা উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দিকে আঙুল তুলেছে বিএনপি।

দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সরকারের যাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের ও কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তারা এনেছেন, তাদের যেন সরকার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, এই আবেদনও তারা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার কাছে।

বিএনপির পর জামায়াতের নেতারা দেখা করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এই বৈঠকে জামায়াত নেতারা তাদের অভিযোগ তুলে ধরেন। বৈঠকে জামায়াত নেতারা কয়েকজন উপদেষ্টার নিরপক্ষেতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, কারও নাম বলেননি। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একজন সচিবসহ কয়েকজন আমলার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জামায়াতের। প্রধান উপদেষ্টা নিজের তত্ত্বাবধায়নে প্রশাসনে রদবদল করার আশ্বাস দিলেও উপদেষ্টা পরিষদ পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু বলেননি।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন দলটির নায়েবে আমি সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। তিনি সংবাদিকদের বলেছেন, তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে কোনো উপদেষ্টার নাম বলেননি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা তাদের অভিযোগের ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করলেন। প্রয়োজনে পরে তারা তাদের কাছে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের নাম প্রকাশ করবেন।

বুধবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জনপ্রশাসনে বদলি-পদায়নে বড় দলগুলোর 'ভাগ-বাটোয়ারায়' উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকে সহায়তা করা হচ্ছে। দলটির এমন বক্তব্য থেকে এটা বলা যায়, তারাও প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছে। বিএনপি, জামায়াতের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপি নেতাদের এই সাক্ষাতের পেছনে ভিন্ন কারণ ছিল বলেও দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এই সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আর এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয় কি না, এ নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছিল। মূলত এ উদ্বেগ নিয়েই তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেন।

এনসিপির সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সংখ্যা বা কলেবর বারুক কিংবা কমুক, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বেই নির্বাচন হবে, এ ব্যাপারে তাদের নিশ্চিত করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত