ভয়ই যখন থেরাপি, হরর সিনেমা কীভাবে কমায় উদ্বেগ

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:২৫ এএম

আপনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন, ভয়ংকর কোনো সিনেমা দেখার পর মনটা যেন হালকা লাগে? কিছুক্ষণ আগে ভয়ে কাঁপলেও শেষে মাথাটা পরিষ্কার লাগে, বাস্তব জীবনের দুশ্চিন্তাগুলোও যেন সাময়িকভাবে হারিয়ে যায়। শুনতে অবাক লাগলেও বিজ্ঞান বলছে—হরর সিনেমা দেখা আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে যারা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তাদের জন্য ভয়ও হতে পারে একধরনের ‘থেরাপি’।

১. কৃত্রিম ভয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে

হরর সিনেমার ভয় বাস্তব নয়। আপনি জানেন, এটি কেবল পর্দার গল্প। ফলে যখন কোনো ভয়ংকর দৃশ্য আসে, শরীর তখনও বাস্তব বিপদের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়—হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, অ্যাড্রেনালিন নিঃসৃত হয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু একইসঙ্গে মস্তিষ্ক জানে আপনি নিরাপদ। এই “নিরাপদ ভয়”-এর অভিজ্ঞতা একধরনের মানসিক অনুশীলনের মতো কাজ করে, যা বাস্তব জীবনের চাপ বা ভয় সামলাতে সাহায্য করে।

২. দেহ-মনের ‘রিসেট বাটন’ টেপা হয়

হরর সিনেমা দেখার সময় শরীর অস্থায়ীভাবে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ অবস্থায় যায়। মানে শরীর নিজেকে বিপদের জন্য প্রস্তুত করে। কিন্তু সিনেমা শেষ হলে শরীর ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়াটি এক ধরনের “রিসেট”—যা উদ্বেগে আক্রান্ত মানুষকে শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়।

৩. ভয় দেখেও মনোবল বাড়ে

ভীতিকর কোনো সিনেমা একা বসে দেখা সহজ কাজ নয়। আপনি যখন তা সফলভাবে শেষ করেন, মস্তিষ্কে একধরনের অর্জনের অনুভূতি তৈরি হয়। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। ‘আমি ভয় পেয়েও টিকে গেলাম’—এই মানসিক বার্তা বাস্তব জীবনের ভীতিকর বা চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও মনকে সাহসী করে তোলে।

৪. বাস্তব দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি

উদ্বিগ্ন মানুষ প্রায়ই নিজের চিন্তার জালে আটকে থাকে। কিন্তু হরর সিনেমা এতটাই মনোযোগ কাড়ে যে অন্য কিছু ভাবার সুযোগই থাকে না। পর্দার ভয়ংকর দৃশ্য, সাউন্ড, রহস্য—সব মিলিয়ে মন একদম অন্য জগতে চলে যায়। মানসিকভাবে এটি এক ধরনের ‘বিরতি’, যা চিন্তা থেকে মুক্তি দেয়।

৫. অ্যাড্রেনালিনের পর সুখের হরমোন

ভয় পেলে শরীরে অ্যাড্রেনালিন বাড়ে, কিন্তু সিনেমা শেষ হলে শরীর সেই উত্তেজনা থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে ডোপামিন ও এন্ডরফিন নামের সুখের হরমোন নিঃসরণ করে। ফলে ভয় শেষে আসে এক ধরনের প্রশান্তি। অনেকটা রোলার কোস্টার চড়ার মতো—ভীতিকর কিন্তু শেষে মজা লাগে।

৬. সামাজিক সংযোগও তৈরি হয়

বন্ধুদের সঙ্গে বসে হরর সিনেমা দেখা একধরনের বন্ধনের অভিজ্ঞতা। একসঙ্গে ভয় পাওয়া, চিৎকার করা, হাসাহাসি—সবই সামাজিক সংযোগ বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যৌথভাবে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পার করা মানুষের মধ্যে আস্থার অনুভূতি বাড়ায়।

৭. ট্রমা মোকাবিলায় সাহায্য করে

মানসিক আঘাত বা ট্রমায় ভোগা অনেকেই বাস্তব ভয় এড়িয়ে চলেন। হরর সিনেমা তাদেরকে নিরাপদ পরিবেশে ভয় অনুভব করার সুযোগ দেয়। এতে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক ভয়কে সহ্য করতে শেখে। অবশ্য এটি সবার ক্ষেত্রে কার্যকর নয়—কাউকে যদি অতিরিক্ত ভয় বা দুঃস্বপ্নে ভোগায়, তবে এমন সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকা ভালো।

শেষ কথা

ভয় মানেই সবসময় খারাপ নয়। কখনো কখনো ভয়ই হতে পারে মানসিক প্রশান্তির উপায়। হরর সিনেমা দেখা মানে নিজেকে মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা, নিজের সীমা বোঝা এবং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করা শেখা। তাই পরেরবার যখন অন্ধকারে বসে হরর সিনেমা দেখবেন, মনে রাখবেন—আপনি শুধু ভয় পাচ্ছেন না, বরং নিজের মনকেও একটু থেরাপি দিচ্ছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত