কানাডায় পড়াশোনার জন্য এসেছিলেন ফেব্রিও ডি জয়সা। ভাড়া থাকতেন শ্রীলঙ্কান একটি পরিবারের সঙ্গে তাদের বাড়ির বেজমেন্টে। এক পর্যায়ে তার অভাব বাড়তে থাকে। একদিকে অর্থের অভাব অপরদিকে স্টুডেন্ট ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে। সবমিলিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি।
সেই হতাশা থেকে ওই পরিবারে মা-সন্তানসহ মোট ৬ জনকে একে একে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন জয়সা। নজিরবিহীন, নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কানাডার একটি আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।
২০২৪ সালের মার্চে কানাডার ইতিহাসে অন্যতম নৃসংশ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী দারশানি একনায়েকে ও তার চার সন্তান— ৭ বছরের ইনুকা, ৪ বছরের আশ্বিনী, ৩ বছরের রানায়া এবং দুই মাস বয়সী শিশু কেলিকে।
এছাড়াও পরিবারের এক বন্ধু, ৪০ বছর বয়সী গামিনি আমারাকুনও অইদিন নিহত হন। দারশানি একনায়েকের স্বামী ধনুশকা বিক্রমাসিংহে সেদিন তাদের বাঁচাতে এসে গুরুতর আহত হন।
বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার সময় জয়সার কর্মকাণ্ডকে ‘বিস্ময়কর ও দানবীয়’ বলে অভিহিত করেন বিচারপতি কেভিন ফিলিপস। তিনি বলেন, ‘তুমি এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন... তুমি অসংখ্য বেদনা ও শোক সৃষ্টি করেছ।’
রায় অনুযায়ী জয়সা আগামী ২৫ বছর পর্যন্ত জামিন বা প্যারোলের আবেদন করতে পারবেন না।
জানা গেছে, শ্রীলঙ্কান ওই ছাত্র অটোয়ার উপশহরে বিক্রমাসিংহে পরিবারের ভাড়া নেওয়া টাউনহাউজের বেজমেন্টে থাকতেন। অটোয়ার মেয়র এই হত্যাকাণ্ডকে শহরের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংস ঘটনার একটি’ বলে উল্লেখ করেন।
আদালতে ডি জয়সা বলেন, পরিবারটি তার প্রতি ‘খুব সদয়’ ছিল, তবে ঘটনার সময় তিনি ‘অসুস্থ’ ছিলেন।
প্রতিরক্ষা আইনজীবী ইওয়ান লিটল স্বীকার করেন, জয়সা অকল্পনীয় অপরাধ করেছেন, কিন্তু বলেন তিনি মানসিক রোগে ভুগছিলেন। কানাডিয়ান সংবাদমাধ্যম জানায়, শুনানির বেশিরভাগ সময় জয়সা নিস্তব্ধ ছিলেন ও তার মধ্যে কোনো আবেগ দেখা যায়নি।
বিচারপতি তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনের বাকি সময়টা এই সত্যটি স্বীকার করে কাটাব—আমি যা করেছি, তার দায় আমার।’
শিশুটি বাদে নিহত সবাই ছিলেন শ্রীলঙ্কান। তদন্তে দে-জয়সা জানান, ২০২৪ সালের ৬ মার্চ তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান কারণ তার টাকা শেষ হয়ে গিয়েছিল। এদিকে তার স্টুডেন্ট ভিসার মেয়াদ শেষের দিকে তবে তিনি কোনোভাবেই শ্রীলঙ্কায় ফিরতে চাননি।
আদালতের মতে, তিনি এক মাস আগে ৩৮ সেন্টিমিটার লম্বা একটি হান্টিং নাইফ কিনেছিলেন, যা দিয়ে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা ছিল তার।
প্রথমে তিনি ৪০ বছর বয়সী আমারাকুনকে বেজমেন্টে সিনেমা দেখার কথা বলে ডেকে আনেন। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে কৌশলে হত্যা করেন। এসময় আমারাকুনের চিৎকার শুনে একনায়েকে তার স্বামীকে ফোন করেন। তার স্বমী বিক্রমাসিংহে তখনও বাইরে ছিলেন।
হত্যাকারী জয়সা তখন ফোনে মিথ্যা বলেন। তিনি জানান, সিনেমার আওয়াজই চিৎকারের মতো শোনাচ্ছে। এরপর তিনি ওপরে উঠে একনায়েকে ও চার শিশুকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন।
কয়েক ঘণ্টা পর বাড়িতে ফিরে বিক্রমাসিংহে নিজেও আক্রান্ত হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দে-জয়সাকে কাবু করতে সক্ষম হন।
পাশের বাসিন্দারা বিক্রমাসিংহের চিৎকার শুনে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে দেখে দে-জয়সা বাড়ির সামনে সিঁড়িতে বসে আছেন। তিনি পুলিশকে বলেন, ‘আমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছিল, আমার কোনো উপায় ছিল না। আমি সবাইকে মেরে ফেলেছি।’
আমারাকুনের স্ত্রী দিশানি আসাঙ্গিকা ফার্নান্দো ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নেন। তিনি বলেন, তার স্বামী ‘নিজের সময়, শক্তি ও স্বপ্ন—সবকিছু আমাদের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।’
বিক্রমাসিংহে বলেন, এই ট্র্যাজেডি ‘আমার পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিয়েছে’ এবং এটি এমন কিছু যা থেকে তিনি কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার পরিবারকে নিয়ে এই দেশে এসেছিলাম একটি ভালো জীবনের আশায়। দয়া করে এই দেশের শান্তি ও স্থিতি নষ্ট করবেন না। আসুন, আমরা একে রক্ষা ও শ্রদ্ধা করি।’
