জীবনের জন্য স্বাধীন শিক্ষা

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৫০ এএম

বেশ কিছুদিন আগের কথা। আমি গিয়েছি বান্দরবান। নোয়াপাড়া, পাহাড়ঘেরা গ্রাম। পাহাড়ের ঢালে মুদিখানার দোকান। সামনে বাঁশের মাচায় বসে আছি। আমার ভেতর কৌতূহল। মুগ্ধ চোখে দোকানিকে দেখছি। তিনি একজন আদিবাসী নারী। ভীষণ সাবলীল। ঠিকঠাক মতো সদাই মেপে দিচ্ছেন। টাকা-পয়সা গুনে নিচ্ছেন। খরিদ্দারের পাওনা ফেরত দিচ্ছেন। বাকিতে জিনিস নিলেন একজন। তিনি দিলেন। দোকানির কাছে ছোট খাতা আছে। সেই খাতায় তিনি বাকির কথা লিখে রাখলেন। আমার আগ্রহের কারণ আছে। আশপাশে কোনো ইশকুল নেই। এখানে পড়াশুনার ব্যবস্থা নেই শুনেছি। এই নারী কোথা থেকে, কীভাবে লেখাপড়া শিখেছেন! সেই ভাবনা আমাকে কৌতূহলী করেছে। তার কাছে জানতে চাইলাম। তিনি আমাকে অবাক করলেন। বললেন, তিনি কখনো ইশকুলে যাননি। লেখাপড়া শেখেননি। দোকানির কাছে তার হিসাব লেখা খাতা দেখতে চাইলাম। তিনি দেখালেন। সেখানে কতগুলো সাংকেতিক চিহ্ন। তাই দিয়ে তিনি মানুষ চেনেন। কার কাছে কত বাকি বুঝতে পারেন। সেই চিহ্নগুলো ওই নারীর নিজস্ব আবিষ্কার। যেমন বড় একখানা পাথর আঁকা। সেটা এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি। আবার গাছের চিকন ডাল এঁকে বুঝেছেন দিনমজুর।  আমার ভাবনায় জট পাকিয়ে গেল। তাহলে শিক্ষা কী? আমরা কী শিখছি? চট করে মনে হলো, শিক্ষা বলতে আমরা জ্ঞান অর্জন বুঝি। যেখানে কিছু বিমূর্ত চিহ্ন, সমীকরণ আর অভিজ্ঞতার কথা শিখি। কেউ শেখেন প্রতিষ্ঠানে। কেউ এই আদিবাসী নারীর মতো জীবনের প্রয়োজনে আবিষ্কার করেন নতুন পন্থা। প্রাতিষ্ঠানিক সেই শিক্ষা নির্দিষ্ট কাঠামোতে জীবন নির্বাহে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল মানুষের মুক্তি, ভাবনার মুক্তি। জ্ঞান, দক্ষতার সঙ্গে মানসিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত আচরণের পরিবর্তন।

শিক্ষা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘শিক্ষা হলো তাই, যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’  এরিস্টটল বলেছেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।’ সক্রেটিস বলেছেন, ‘শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।’ আমি শান্তভাবে ভাবলাম। একজন শিক্ষিত মানুষ তার ভেতরের শক্তি ও সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাবেন। তিনি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেকে শামিল করবেন। অন্যদের শ্রদ্ধা করবেন। স্বাভাবিকভাবেই একজন শিক্ষিত মানুষ দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হবেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে এমন প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা হবে দেশপ্রেমিক, যুক্তিবাদী, মূল্যবোধসম্পন্ন ও প্রজ্ঞানুশীলন মানুষ। শিক্ষিত মানুষ কখনো শিশুর প্রতি সহিংস হতে পারেন না। তিনি কখনো নারী নির্যাতনের মতো হীন কাজ করবেন না। একজন শিক্ষিত মানুষ হবেন সমাজের অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি। সেটাই আমাদের শিক্ষা। আমরা তাই শিখব। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নিজেকে সেভাবেই গড়ে তুলব। দেশ নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। অলীক নয়, বাস্তব স্বপ্ন সেসব। স্বপ্ন দেখার ভিত্তি হচ্ছে, আমাদের সক্ষমতা। যে সৃষ্টিতে ত্যাগ-যন্ত্রণা যত বেশি, সেখানে প্রত্যাশা তত বড়। আমরা প্রত্যাশা করেছি এমন এক জীবনের যে জীবন হবে বঞ্চনাহীন, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানের। সেই জীবন বিকাশের সম্ভাবনা নিহিত আছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। শিক্ষা সর্বজনীন মানবাধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের জন্য শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধান অনুযায়ী সবার জন্য বাস্তবমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার ব্যাপারটা তো নিছক জ্ঞান বিতরণের জন্য নয়, আমাদের সংবিধানও তেমনটি বলেনি। শিক্ষার প্রয়োজন জীবনের জন্য, বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজনে একসময় এ দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তা ছিল মূলত শাসকের চাহিদা নির্ভর। সেই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য ছিল কর্মজীবন নয়, চাকরিজীবন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই ঔপনিবেশিক কাঠামোর ছাপ থেকে গেছে এখনো। এ দেশের জনগণের জীবনের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যার যোজন ফারাক। জীবন থেকে শিক্ষা এমন বিচ্ছিন্ন বলেই যিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি প্রায়শ উৎপাদনশীল হয়ে ওঠেন না বা মানবসম্পদে রূপান্তরিত হন না। তবে সুখের বিষয় এই যে বাংলাদেশের ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ সেই সংকট থেকে আমাদের মুক্ত করে আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরির দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তিযোগ্য বয়সের শিশুদের প্রায় ৯৮ (নেট) শতাংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি)-র বেসলাইন জরিপ থেকে দেখা যায় প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক (৪৭ শতাংশ) প্রাথমিক বৃত্ত অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সমাপন করতে পারে না। এই সমস্ত শিশুর একটি বড় অংশ আবার আসে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবার থেকে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে একদিকে যেমন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বিশেষভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের কথা মনে রেখে মূলধারার সরকারি ও বেসরকারি (এনজিও এবং ব্যক্তিমালিকানাভুক্ত) স্কুলে শিক্ষার একটা সর্বনিম্ন এবং গ্রহণযোগ্য মান অর্জনের নিশ্চয়তা বিধান করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি যারা স্কুলে ভর্তি হয় না বা ঝরে পড়ে এমন ধরনের স্কুল বহির্ভূত শিক্ষার্থীদের জন্য উপানুষ্ঠানিক ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষাধারা চালু করতে হবে। স্কুল বহির্ভূত সুবিধাবঞ্চিত যে শিশু শ্রমে নিয়োজিত সে সামাজিক বিভিন্ন অব্যবস্থার শিকার হয়। বাস্তবতার নানা রূঢ়তার মধ্য দিয়ে তাকে জীবনযাপন করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এসব শিশুর স্বভাব-প্রকৃতি স্কুলে পড়ুয়া অন্য শিশুদের থেকে ক্রমশ ভিন্ন হতে থাকে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উপযোগী শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

প্রত্যাশার মুক্তি: আমাদের শিক্ষা কখনো আমাদের হয়ে ওঠে না। কারণ আমাদের যা শেখানো হয়, বেশিরভাগ সময় তা দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। শিক্ষার শুরুতেই শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি, তারা আদতে কী শিখতে চায়? তারাই নির্ধারণ করবে, কেন তারা তা শিখতে চায়। অবদমিত মানুষ তার নিপীড়িত সত্তাকে মেলে ধরতে পারে না। পক্ষান্তরে, এই প্রয়াস সেই মানুষের প্রত্যাশার মুক্তি ঘটাতে সহায়তা করবে। প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী তার প্রত্যাশাকে তুলে ধরবে। বই থেকে নয়, জীবন থেকে শেখা : আমাদের পারিপার্শ্বিক সমাজ সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে দেখতে ভালোবাসে। তাই সমাজ জীবনাচরণের নানান ছক তৈরি করে। আর জীবন সেই কাঠামোর মধ্যে, ছক মেনে নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতির গণ্ডিতে বেড়ে ওঠে। আমাদের বসবাস হয় একটি আবদ্ধ বাস্তবতায়। আমরা ছিটকে পড়ি কিন্তু আমাদের মুক্তি মেলে না। যে কোনো ছাপানো বইতে আগে থেকে নির্ধারণ করা কতগুলো শব্দ থাকে, অনুমান করা হয় যা থেকে শিক্ষার্থীরা শিখবে। এই শব্দ সমষ্টি শিক্ষার্থীকে কেবল ভারাক্রান্ত করে মাত্র। কখনো তারা সেখান থেকে কিছু জানে বটে, তবে তা থেকে তাদের আচরণের পরিবর্তন নাও হতে পারে। এই প্রক্রিয়া মানুষকে একটি যান্ত্রিক কিংবা জড়বস্তুতে পরিণত করে। তারা জীবন্ত, সৃজনশীল ও সক্রিয় মানুষ হিসেবে কখনোই গড়ে ওঠে না। শিক্ষাব্যবস্থা হবে এমন যেখানে শিক্ষার্থীরা শুরু করবে ছবি আঁকার মাধ্যমে। যা তার অভিজ্ঞতায় আছে। এরপর সেই ছবি থেকে কিংবা নিজেদের জীবনে প্রতিদিন উচ্চারিত শব্দ বেছে নেবে তারা। সেই শব্দগুলো থেকে বর্ণ এবং কার চিহ্ন মিলিয়ে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করবে। নতুন কিছু সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে তাদের ভেতর আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে, তারা বুঝবে, তাদের দ্বারাও কিছু করা সম্ভব, তারাও পারে।

আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠা : সুবিধাবঞ্চিত মানুষ কখনো আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে না। তাদের নানা ধরনের বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন। সমাজের অন্যায়, অবিচার, দমন-পীড়ন জন্মের পর থেকে একজন শিশুকে চুপচাপ সব কিছু মেনে নিয়ে নিজেকে কেবল টিকিয়ে রাখতে শেখায়। তারা না পারে তাদের কোনো অধিকার রক্ষা করতে, না পারে সেই নির্যাতন নিপীড়নের অস্তিত্ববিহীন, অমর্যাদাকর, আবদ্ধ একটা জীবন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে। শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন তাদের জীবন দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যার যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করতে এবং সেই সমাধান বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে। শিশু হয়ে উঠবে আত্মপ্রত্যায়ী মানুষ। তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রশ্ন বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে, সন্দেহ দূর করতে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে এবং আত্মবিশ^াস তৈরি করতে সাহায্য করে।  কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ানো : যারা স্কুলে ভর্তি হয় না অথবা হলেও ঝরে পড়ে, তাদের অধিকাংশই হতদরিদ্র, দরিদ্র অথবা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। যাদের অনেকেই আবার শ্রমে নিয়োজিত শিশু। পারিবারিক অর্থনৈতিক টানাপড়েন সামাল দিতে গিয়ে অভিভাবকরা শিশুদের বাধ্য করেন শ্রমে নিয়োজিত হতে ও অর্থ উপার্জনে।  এই অবস্থা মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষাকে অবশ্যই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সেই কারিগরি শিক্ষায় অনুসৃত শিক্ষাক্রম জীবন ও চাহিদাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ হবে। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রমবাজারে চাহিদা আছে এমন মানসম্পন্ন এবং উপযুক্ত কারিগরি শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে।  স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: শিক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রম কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ হিসেবে পরিচালিত হবে না। এই উদ্যোগ গৃহীত হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন থাকবে। স্থানীয় মানুষের কাছে শিক্ষাব্যবস্থার ধারা সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হবে। সংস্কৃতি বলতে বলা হচ্ছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তৈরি জীবনযাত্রার ছক। সমাজে যে কোনো সময় লভ্য এই ছকগুলোই মানুষের আচরণবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

লেখক: চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ

[email protected] 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত