গাজার আকাশে ফের আগুন, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারাল ৩ ফিলিস্তিনি

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০৪ এএম

গাজায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় অন্তত ৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। একই সময়ে দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নিহত তিনজনের পাশাপাশি গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগ আল-শিফা হাসপাতালে ৩৫টি অজ্ঞাত ফিলিস্তিনির মরদেহ হস্তান্তর করেছে, যাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ১৮২ জনে। আহত হয়েছেন অন্তত এক লাখ ৭০ হাজার ৬৯৪ জন। গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ২৪৫ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে পরিচালিত হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন এবং প্রায় ২০০ জনকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়।

গাজাজুড়ে এখনও হাজারো নিখোঁজ মানুষের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আল-জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুমের বরাতে জানা যায়, গাজার বহু পরিবার এখনো মরদেহ শনাক্ত করতে হাসপাতাল, মর্গ ও আইডেন্টিফিকেশন সেন্টারে ঘুরছেন—প্রিয়জনদের দেহাবশেষ চেনার চেষ্টা করছেন পোশাক, দাগ বা ব্যক্তিগত সামগ্রীর মাধ্যমে।

তিনি বলেন, ‘গাজায় ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা গুরুতর সংকটে আছেন। মরদেহ পচে যাওয়ায় শনাক্তকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে, সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জামও স্বল্প। এতে পরিবারগুলো গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছে, বিশেষ করে মায়েরা প্রতিদিন হাসপাতালে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন।’

গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানায়, ১০ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েল অন্তত ২৮২ বার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে—বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও সরাসরি গুলি চালনার মাধ্যমে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধবিরতির ৩১ দিনের মধ্যে ২৫ দিনই ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ছয় দিন কোনো সহিংসতা, মৃত্যু বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি।

তবু যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর আছে।

এদিকে, চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির পরপরই গাজায় পূর্ণাঙ্গ মানবিক সহায়তা পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ মঙ্গলবার অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজায় জরুরি সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৬ লাখ শিশুর টিকা প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ এবং প্রায় ১০ লাখ বোতল শিশুখাদ্য।

ইউনিসেফ মুখপাত্র রিকার্দো পিরেস বলেন, ‘ইসরায়েল এসব সামগ্রীকে ‘ডুয়াল ইউজ’ বা সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে গণ্য করছে। ফলে ক্লিয়ারেন্স পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, অথচ এগুলো অত্যন্ত জরুরি।’

এই বাধার কারণে যুদ্ধকালীন সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত ৪০ হাজারের বেশি শিশুকে এখনো টিকাদান শুরু করা যায়নি। আগস্ট থেকে সিরিঞ্জগুলো ইসরায়েলি কাস্টমসে আটকে আছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার ৪৫১টি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করতে পেরেছে, যা বাস্তুচ্যুত ও অপুষ্টিতে ভোগা দুই মিলিয়ন মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য।

বিদ্যুৎবিহীন গাজায় এখন মানুষ রাত কাটাচ্ছে অন্ধকারে, অনেকে টর্চলাইটের আলোয় দিনযাপন করছে। গাজার বিদ্যুৎ কোম্পানির কর্মকর্তা মোহাম্মদ থাবেত বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে গাজায় এক ইউনিটও বিদ্যুৎ প্রবেশ করেনি। বিদ্যুতের পরিমাণ এখন শূন্য।’

ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, দখলকৃত পশ্চিম তীরে মঙ্গলবার মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা দুটি ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালিয়ে গাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তিতে আগুন দেয়। এতে চারজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

বেত লিদ ও দেইর শরাফ গ্রামে এসব হামলায় চারটি দুধবাহী ট্রাক, কৃষিজমি, টিনের ঘর ও বেদুইনদের তাঁবুতে আগুন দেওয়া হয়।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মুআইয়াদ শাবান বলেন, এসব হামলা ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার এক সংগঠিত প্রচেষ্টা, আর ইসরায়েল তাদের এই অপরাধে পূর্ণ সুরক্ষা দিচ্ছে।

ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, “চরমপন্থী সহিংসতা”-তে জড়িত অভিযোগে চার ইসরায়েলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আল-জাজিরার ফ্যাক্টচেক ইউনিট ‘সানাদ’ যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিরা আগুন লাগা যানবাহন নেভানোর চেষ্টা করছেন।

ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এ ধরনের হামলাকে “ভয়াবহ ও গুরুতর” আখ্যা দিয়ে বলেন, “নাগরিক বা সেনাদের ওপর এমন হামলা রেড লাইন অতিক্রম করেছে, আমি এর কঠোর নিন্দা জানাই।”

এদিন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ইসরায়েলি সেনারাও আক্রান্ত হন, একটি সামরিক যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উপনিবেশ ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশনের (সিআরআরসি) তথ্যমতে, গত মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মিলে অন্তত ২ হাজার ৩৫০টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮৪টি সরাসরি হামলা, ঘরবাড়ি ধ্বংস ও জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে।

সিআরআরসি প্রধান মুআইয়াদ শাবানের হিসেবে, হামলার বেশিরভাগই হয়েছে রামাল্লাহ, নাবলুস ও হেবরন অঞ্চলে।

মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেম জানায়, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা এখন প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে—গুলিবর্ষণ, মারধর, হুমকি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, গাছপালা ধ্বংস, পণ্য লুট, সড়ক অবরোধ, এমনকি গাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।

ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের এসব অপরাধে প্রায়ই দায়মুক্তি দেওয়া হয়, বরং অনেক সময় তাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারাও উপস্থিত থাকে।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত