দেশের নারীদের আবারও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নারীনেত্রী ও সচেতন নাগরিকরা। নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করার প্রস্তাবকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। তাদের বক্তব্য, নারী বাইরে কাজ করবে না ঘরে থাকবে, এটা কারও নির্দেশ দেওয়ার বিষয় নয়; এটা সম্পূর্ণ নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নারীর ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অসম্মান : প্রতিরোধে প্রস্তুত সচেতন নারী সমাজ’ শীর্ষক এক মৌন মিছিল ও সমাবেশে এই প্রতিবাদ জানানো হয়। নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শত শত নারী মুখে কালো কাপড় বেঁধে নীরব প্রতিবাদ জানান এবং পরে একবাক্যে স্লোগান দেন ‘পাঁচ নয় আট, তুমি বলবার কে?’
কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল ধর্মকে ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে নারীদের অন্দরমহলে বন্দি রাখতে চায়। তাদের পরিকল্পনা, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেন অন্ধকারে থাকে, নারীর অগ্রগতি যেন বাধাগ্রস্ত হয়। সেজন্যই কর্মঘণ্টা কমিয়ে নারীদের চাকরি-কর্মসংস্থান হ্রাস করার ষড়যন্ত্র চলছে। কর্মঘণ্টা কমালে নারীদের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম, গত ১৭ বছর ধরে নারীরা যে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তার অবসান হবে। নারী তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাবেন। কিন্তু আজ দুঃখের সঙ্গে দেখছি, নারীদের আবার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কর্মঘণ্টা কমিয়ে তাদের ঘরে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। তাই নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নারীদের আরও জোরালোভাবে রাজপথে নামতে হবে।’
কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন ফোরামের সদস্য সচিব নিপুণ রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আজকের এই কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেলাম নারীর অধিকার নিয়ে কোনো রকম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে দেশের নারী সমাজ আর চুপ করে থাকবে না, জেগে উঠবে।’
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, ‘নারীর অধিকার কারও দান বা দয়ার বিষয় নয়, এটা মানুষের মৌলিক অধিকার। নারী ঘরে থাকবেন না বাইরে কাজ করবেন, এ সিদ্ধান্ত শুধুই নারীর নিজস্ব। কেউ তার ওপর সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরীন ইসলাম খান বলেন, ‘পুরুষ নারীর শত্রু নয়, সহযোদ্ধা। যেসব পুরুষ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন, তাদের পাশেও তিনি দাঁড়ান।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে জুলাই সনদে নারীর কথা নেই, সেই সনদ নারীরা প্রত্যাখ্যান করছে। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন রাতের বেলা একজন নারী নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।’
মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তন দেখেছিলাম, কিন্তু এখন আবার শুনতে হচ্ছে কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখনো নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়নি।’ ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ বলেন, ‘রাজনীতি হোক বা পারিবারিক ক্ষেত্র কিংবা যেকোনো ক্ষেত্র নারী যখনই মুখ খুলেছেন, তখনই তাকে ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক বা মতাদর্শ নিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে নারীকেই কথা বলতে হবে।’
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম, নিলুফা চৌধুরী, শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আলম, সহসভাপতি রেহানা আক্তার প্রমুখ।
