বাবার আহাজারি

‘ছাত্রলীগ’ সন্দেহে ১৪ বছরের কিশোর গ্রেপ্তার, দিতে পারেনি বার্ষিক পরীক্ষা

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৮ পিএম

‘ছাত্রলীগ কর্মী’ সন্দেহে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার কিশোরের নাম ইমরান হোসেন মিয়া। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সে (রোল-৪৮)।

মাধ্যমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা আজ বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) এক যুগে শুরু হয়েছে। সারাদেশের শিক্ষা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ একই সময়ে মাধ্যমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাগুলো শুরু হয়েছে। তবে পরীক্ষা দিতে পারেনি ইমরান। বর্তমানে সে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আগামী পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে গত ১১ নভেম্বর স্কুলের বেতন ও সেশন ফি বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেয় ইমরান। এরপরই ১৭ নভেম্বর রাতে নাঙ্গলকোট থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। মামলাটি হয়েছে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে (মামলা নং-১২/১৬৬)।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ইমরান (১৫) ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী’। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার রায়ের প্রতিবাদে ঢালুয়া এলাকায় ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহন করেন। পাশাপাশি সরকারবিরোধী স্লোগান, সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

ঘটনার পর ছেলের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিয়ে বাবা ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে, পাননি কারও সহযোগিতা।

ইমরান হোসেন উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের চিওড়া গ্রামের ক্ষুদ্র ডেকোরেটর ব্যবসায়ী ইসহাক মিয়ার ছেলে। ইসহাক মিয়া দাবি করেছেন, তিনি নিজেও কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে নিজ বাড়ি থেকে ইমরানকে আটক করে নাঙ্গলকোট থানা-পুলিশ। পরদিন পুলিশ বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। আটকের পর ছেলের পরীক্ষার প্রবেশপত্র নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন ইসহাক মিয়া, তাতে কোনো লাভ হয়নি।

এ বিষয়ে ইমরানের বাবা ইসহাক মিয়া কান্নাজড়িত কন্ঠে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলে নিতান্তই শিশু। সে রাজনীতি বোঝে না। এলাকার মানুষের কাছে জানতে পারেন, কোথাও কোনো সংগঠনে তার সম্পৃক্ততা নেই। পরীক্ষার ঠিক আগে এমন মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে তার জীবন নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, আজ বৃহস্পতিবার স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে, কিন্তু ছেলের জায়গা হয়েছে কারাগারের অন্ধকার কক্ষে।

আইনজীবীরা বলছেন, শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু হিসেবে গণ্য। এমন ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার, হাজত বা আদালতে প্রেরণের প্রক্রিয়ায় বিশেষ সুরক্ষা প্রযোজ্য। ইমরানকে সাধারণ বন্দির মতো আদালতে পাঠানো হয়েছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একে ফজলুল হক বলেন, শুনিদিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি পরীক্ষার্থী কি না—তা আমাদের জানা নেই। পরীক্ষার্থী হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক স্কুলছাত্রকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের প্রশ্ন, ‘অষ্টম শ্রেণির ছাত্র কীভাবে নাশকতার মতো গুরুতর অভিযোগে জড়িত হতে পারে? ইমরানের পরিবার তদন্তসাপেক্ষে তাঁর মুক্তি এবং বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

স্কুলছাত্র ইমরান ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত, এমন কোনো প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক বলেন, ‘আমাদের কাছে ছেলেটির কোনো ছবি বা ভিডিও নেই। তবে ওই দিন রাতে তাকে গ্রেপ্তারের আগে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের তথ্যে ইমরানের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। তারা নিশ্চিত করেছে, ইমরান নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং ঝটিকা মিছিলে অংশ নিয়েছে। এ জন্য তাকে গ্রেপ্তার করে যথাযথ নিয়ম মেনে আদালতের মাধ্যমে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত