একযোগে ৩ শতাধিক বদলি র‌্যাব-১৫ সিও ক্লোজড

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:১৫ এএম

ইয়াবা ও অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কক্সবাজার এবং বান্দরবান নিয়ে গঠিত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১৫-এ কর্মরত তিন শতাধিক সদস্যকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। তার মধ্যে ওই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানকে ক্লোজড করে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক কামরুল হাসান ও তার ঘনিষ্ঠ লোকজন সেখানে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মাদকের একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিও এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা ইয়াবা উদ্ধার করে মামলায় কম দেখানো, আর্থিক অনিয়ম ও কয়েকটি বিতর্কিত অভিযান করে নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেন। এমনকি সিওর আত্মীয়স্বজন কক্সবাজারে ঘুরতে যাওয়া এবং হোটেলে থাকা-খাওয়ার খরচ, ভ্রমণ খরচ সবই বহন করা হয়েছে ব্যাটালিয়ন থেকে। গত এক বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যা বর্তমানে র‌্যাবের বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব কক্সবাজার, টেকনাফ এবং বান্দরবানে ভ্রমণের জন্য র‌্যাবের গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। লে. কর্নেল কামরুল হাসানের এসব অপকর্ম থেকে বাঁচতে তার নিচের পদের কর্মকর্তাদের ফাঁসানোর জন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টির তদন্ত চলছে। নানা বিতর্কিত ও ইয়াবা জব্দ নাটকীয়তা এবং অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনার পরও র‌্যাব মহাপরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (অপস) নির্দেশনায় লে. কর্নেল কামরুল হাসানকে বাহিনীতে ফেরত না পাঠিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ সদস্য এবং একই তারিখে আরেকটি প্রজ্ঞাপনে আরও ২০০ সদস্যকে বদলি করা হয়। এরপর ২৭ নভেম্বর তৃতীয় দফায় আরও ৭৪ সদস্যকে বদলি করা হয়। এসব প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিন দফায় যাদের বদলি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিন শতাধিক সদস্যই র‌্যাব-১৫-এ কর্মরত ছিলেন। ফলে এক ইউনিট থেকেই এত বৃহৎসংখ্যক সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ইয়াবা ও অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে যারা যারা দোষী হবেন, তারা বিধি অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আসবেন। যারাই র‌্যাবে থেকে অন্যায় করবেন, তাদের ব্যাপারে র‌্যাব জিরো টলারেন্স। তবে এই অভিযোগে র‌্যাব-১৫ থেকে একযোগে তিন শতাধিক সদস্যকে প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ, সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। র‌্যাবের এই বদলির বিষয়টিও সরকারে নির্দেশনায় হয়েছে। কারণ অনেক ব্যাটালিয়নে জনবল কম। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোয় লোকবল বাড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা আত্মসাৎ, অনিয়ম ও তথ্যবিভ্রাট নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, র‌্যাবের মিডিয়া উইং জানিয়েছে, তদন্ত চলমান এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, এক বছর র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নেয়ামুল হালিম খান, যিনি করোনাকালে যশোর সেনানিবাসের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের ৩৭ বীরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এদিকে র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, লে. কর্নেল কামরুল হাসান এবং তার স্ত্রী-সন্তানের যাবতীয় খরচ বহন করা হতো ব্যাটালিয়ন থেকে। এ ছাড়া শ্বশুরবাড়ি এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবকে যেসব হোটেলে রাখা হয়েছে, তাদের খাদ্য, ফুল, ফল ও বিভিন্ন গিফটের অর্থ ব্যয় করা হতো ওই ব্যাটালিয়নের অর্থে। এ ছাড়া যাতায়াত এবং ভ্রমণের জন্য র‌্যাবের গাড়ি ব্যবহার করা হতো।

র‌্যাব-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বাস্তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে র‌্যাব-১৫-কে ঘিরে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠার পর সদর দপ্তরে বিশেষ তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তে দুটি আলোচিত অভিযানকে কেন্দ্র করে গুরুতর অসংগতি বেরিয়ে আসে, যার পরিপ্রেক্ষিতেই গণবদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানতে পারে বিভিন্ন পক্ষ। গত ৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং পশ্চিমপাড়ায় অভিযানে দুই নারীকে ৮৯ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ আটক দেখায় র‌্যাব-১৫। উদ্ধার দেখানো হয় আরও ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৮৩০ টাকা। তবে অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত ইয়াবার পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ইয়াবা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মামলায় স্থানীয় যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিনের সহযোগী সেলিম উদ্দিনের নাম ‘ভুল তথ্য দিয়ে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, একজন মাদক কারবারি সেলিমকে রক্ষা করতে নামের মিল ব্যবহার করে তাকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নভেম্বরের শুরুতে র‌্যাব সদর দপ্তরের একটি তদন্ত দল সরেজমিনে পরিদর্শনে যায় বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন।

এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায় আরেকটি অভিযানে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তার করার পর র‌্যাব-১৫ তার কাছ থেকে সাতটি ইটের টুকরো ও দুটি কাঠের লাঠি উদ্ধার দেখায়। এই অস্বাভাবিক জব্দতালিকা স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করে। দুটি অভিযানের নেতৃত্বেই ছিলেন তৎকালীন র‌্যাব-১৫ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান, আর তার ঘনিষ্ঠ টেকনাফ এফএস কমান্ডার করপোরাল ইমামকে এসব বিতর্কিত অভিযানের মূল নেপথ্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে র‌্যাবের একাধিক সূত্র।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত