আত্মগোপনে থাকার পর প্রথমবার প্রকাশ্যে মাচাদো

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:২৮ এএম

কয়েক মাস ধরে আত্মগোপনে থাকা ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানিয়েছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করতে নরওয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি ঠিক কোন ঝুঁকি নিচ্ছেন, তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।

মাচাদোকে মধ্যরাতে অসলোতে একটি হোটেলের বারান্দায় দেখা যায়, যেখানে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। জানুয়ারির পর এটাই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি।

সরকার কর্তৃক আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং নরওয়ে গেলে তাকে ‘পলাতক’ ঘোষণা করা হবে—এমন হুমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি গোপনে যাত্রা করেন।

এক আবেগঘন মুহূর্তে মাচাদো হোটেলের বাইরে জড়ো হওয়া উল্লাসিত সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান, তাদের দিকে চুম্বন ছুড়ে দেন এবং তাদের সঙ্গে গান গান।

সমর্থকদের আরও উৎসাহিত করতে তিনি পরে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং নিরাপত্তা ব্যারিকেড টপকে তাদের আরও কাছে গিয়ে অভিবাদন জানান।

এর আগেই বুধবার তার মেয়ে আনা কোরিনা সোসা মায়ের পক্ষ থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। এ বছর নোবেল ইনস্টিটিউট মাচাদোকে পুরস্কৃত করেছে ‘ভেনেজুয়েলায় স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ উত্তরণের লড়াইয়ের’ স্বীকৃতি হিসেবে।

মাচাদো ও তার সন্তানরা প্রায় দুই বছর ধরে আলাদা। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তাদের ভেনেজুয়েলা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

ব্যালকনিতে উপস্থিতির পর বিবিসির লুসি হকিংসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাচাদো জানান, তিনি তাদের গ্র্যাজুয়েশন এবং তার মেয়ে ও এক ছেলের বিয়েও মিস করেছেন। মাচাদো বলেন, ‘প্রায় ১৬ মাস ধরে আমি কাউকে জড়িয়ে ধরতে বা স্পর্শ করতে পারিনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছি, তাদের ছুঁতে পেরেছি, কাঁদতে পেরেছি এবং একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পেরেছি।’

সাক্ষাৎকারে তার গলায় ঝোলানো জপমালা মালা দেখা যায়। তিনি জানান, হোটেলের বাইরে মানুষ এগুলো তাকে উপহার দিয়েছে।

মাচাদো অনেক দিন ধরেই প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে ‘অপরাধী’ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন এবং ভেনেজুয়েলাবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্ষমতাসীন সরকারকে সরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অসলোতে ব্যারিকেড টপকে ভক্তদের আরও কাছ থেকে অভিবাদন জানান মাচাদো

তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিরোধী শিবিরের সর্বাধিক সম্মানিত কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। তবে তাকে গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়, যেখানে মাদুরো ছয় বছর মেয়াদের তৃতীয় দফা বিজয় ঘোষণা করেন। অনেক দেশই তার শাসনকে অবৈধ হিসেবে দেখছে।

গত মাসে ভেনেজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নোবেল পুরস্কার নিতে নরওয়ে ভ্রমণ করলে মাচাদোকে ‘পলাতক’ বিবেচনা করা হবে, কারণ তার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র, ঘৃণায় উসকানি এবং সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তার নরওয়ে যাত্রার বিবরণ এতটাই গোপন রাখা হয় যে নোবেল ইনস্টিটিউট পর্যন্ত জানত না তিনি কোথায় আছেন বা পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারবেন কি না।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োর্গেন ওয়াতনে ফ্রিডনেস এটিকে চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনেজুয়েলা ছাড়তে মাচাদো ছদ্মবেশ পরেছিলেন, ১০টি সামরিক চেকপয়েন্ট ফাঁকি দিয়ে অবশেষে উপকূলের এক মাছ ধরার গ্রাম থেকে কাঠের নৌকায় চড়ে দেশ ত্যাগ করেন।

দুই মাস ধরে এই পরিকল্পনা সাজানো হয় এবং তাকে সাহায্য করে দেশত্যাগে লোকজনের সহায়তা প্রদানকারী এক ভেনেজুয়েলান নেটওয়ার্ক। যুক্তরাষ্ট্রও এতে সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনটি জানায়, যদিও সেই সম্পৃক্ততার মাত্রা পরিষ্কার নয়।

মাচাদো বলেন, ‘তারা (সরকার) বলে আমি সন্ত্রাসী এবং আমাকে জীবনের বাকি সময় কারাগারে থাকতে হবে, তারা আমাকে খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে আজ ভেনেজুয়েলা ছাড়াটা অত্যন্ত, অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি শুধু বলতে চাই, আমি আজ এখানে এসেছি কারণ বহু নারী-পুরুষ তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আমাকে অসলোতে পৌঁছাতে সাহায্য করেছেন।’

মাচাদো নিরাপদে ভেনেজুয়েলায় ফিরতে পারবেন কি না—এ নিয়ে বহু জল্পনা রয়েছে। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘অবশ্যই আমি ফিরব। আমি ঠিক কী ঝুঁকি নিচ্ছি, তা আমি জানি। আমি সেই জায়গায় থাকব, যেখানে আমাদের আন্দোলনের জন্য আমি সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারি। অল্প কয়েক দিন আগেও আমি ভাবতাম আমাকে ভেনেজুয়েলাতেই থাকতে হবে, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমাদের আন্দোলনের স্বার্থে আমাকে অসলোতেই থাকতে হবে।’

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর মাচাদো বিশেষভাবে প্রশংসা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে—যিনি নিজেও শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা খোলাখুলিভাবে জানান এবং বর্তমানে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সামরিক উত্তেজনায় জড়িত।

বুধবার তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে, যা মাদুরো সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ বৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

মার্কিন সরকার দাবি করেছে, জাহাজটি নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ছিল এবং বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সহায়তায় অবৈধ তেল পরিবহণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।

ভেনেজুয়েলার সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে চুরি ও জলদস্যুতা বলে আখ্যা দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত