গাজায় চিকিৎসা সংকট চরমে, সহায়তা প্রবেশে জরুরি আহ্বান

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৮ এএম

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবরোধ ও চিকিৎসা সামগ্রী প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ–জ্বালানির অভাবে হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও বহু মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ‘করুণ ও ভয়াবহ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল নিয়মিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী ট্রাক প্রবেশে বাধা দেওয়ায় গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। স্যালাইন, অবশ করার ওষুধ, গজ, ডায়ালাইসিস সামগ্রীসহ মৌলিক চিকিৎসা উপকরণের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের মারাত্মক ঘাটতি, যা চিকিৎসা কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশের অনুমতি মিলছে না বলে অভিযোগ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের। তাদের মতে, নির্ধারিত সংখ্যক সহায়তা ট্রাক ঢুকতে না দেওয়ায় চলমান স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। গাজার চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, জীবনরক্ষাকারী মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম না পেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠনের পর গত তিন দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট। ইসরায়েলের টানা আগ্রাসনে গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ১২৫টি স্বাস্থ্য স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে ৩৪টি হাসপাতাল। এই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজার ৭০০ জনেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী। এখনো ৯৫ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ইসরায়েলের হেফাজতে আটক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই গাজার বাসিন্দা।

এই সংকট শুধু যুদ্ধাহতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসার অভাবে প্রায় চার হাজার গ্লকোমা রোগী স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার বাস্তুচ্যুত অন্তঃসত্ত্বা নারী অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছেন, যা তাদের ও অনাগত সন্তানের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের অবস্থাও উদ্বেগজনক—পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

গাজার বাইরে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও সেই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় ইতোমধ্যে অন্তত এক হাজার ১৫৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গাজা থেকে পাঠানো রোগীদের তালিকা প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যালোচনা করে, এরপর নিরাপত্তা অনুমোদনের জন্য তা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫০০ জনকে অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রায় তিন হাজার ৭০০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে প্রায় চার হাজার ৩০০ শিশু।

এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে সীমান্ত ক্রসিং খুলে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং গুরুতর রোগীদের বাইরে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুনির আল-বারশ। তাঁর সতর্কবার্তা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অসংখ্য প্রাণ ঝরে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত