২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে আর্জেন্টিনা দলে যত কাকতালীয় ঘটনার ঢেউ

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:২৬ এএম

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ততই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে ঘিরে প্রত্যাশা ও উত্তেজনা বাড়ছে। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের চার বছর পর শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে আবারও জোরালোভাবে ফিরে এসেছে ‘এলিহো ক্রেয়ের’—অর্থাৎ ‘আমি বিশ্বাস করি’ নামের সেই আবেগী দর্শন। পরিসংখ্যান, সংখ্যাগত পুনরাবৃত্তি, আগের বিশ্বকাপগুলোর সঙ্গে মিল খোঁজা নানা কাকতালীয় ঘটনাই এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করছে।

এই বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে আসছে তথাকথিত ‘৩৬ বছরের নিয়ম’। ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা ১৯৭৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিল, ঠিক ৩৬ বছর পর ২০১৪ সালে আবার ফাইনালে ওঠে। ১৯৮৬ সালে শিরোপা জয়ের ৩৬ বছর পর, ২০২২ সালে কাতারে আবার চ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে ফাইনাল খেলা হিসেব করলে ৩৬ বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালে, যদিও তারা গত বিশ্বকাপেই শিরোপা জিতেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সমর্থকদের আলোচনায় আরও কিছু চমকপ্রদ মিল উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯৫৮ সালের ব্রাজিল দলের সঙ্গে তুলনা। কাতারে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর লিওনেল স্কালোনির দল ঘরের মাঠে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল। এর মধ্যে পানামার বিপক্ষে ২-০ এবং কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭-০ ব্যবধানে জিতেছে। আশ্চর্যজনকভাবে, ১৯৫৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর পেলের ব্রাজিলও ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডকে ২-০ এবং চিলিকে ৭-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল। সেই ব্রাজিলই পরে ১৯৬২ সালে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে।

আরও একটি মিল রয়েছে অলিম্পিক মঞ্চে—১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপের মাঝখানে ব্রাজিল অলিম্পিকে কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির কাছে হেরেছিল। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে একই পর্যায়ে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে বিদায় নেয়।

বিশ্বাসীদের চোখে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কিছু দলের অনুপস্থিতি। ১৯৮৬ ও ২০২২—এই দুই বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, আর সেই দুই আসরেই নাইজেরিয়া মূল পর্বে খেলতে পারেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপের পথেও রিপাবলিক অব কঙ্গোর কাছে প্লে-অফে হেরে আপাতত ছিটকে গেছে নাইজেরিয়া, যদিও বিষয়টি এখনো আপিলের মধ্যে রয়েছে। তবুও, সমর্থকদের কাছে এটিও আরেকটি ‘শুভ সংকেত’।

ফিফা র‍্যাংকিং নিয়েও রয়েছে কুসংস্কারমিশ্রিত যুক্তি। ফিফা র‍্যাংকিং চালুর পর থেকে কোনো দলই বিশ্বকাপে এক নম্বর দল হিসেবে এসে শিরোপা জিততে পারেনি। কাতার বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা এক নম্বরে উঠলেও পরে সেই অবস্থান হারিয়ে এখন দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে—যাকে অনেকে ‘আরও সুবিধাজনক’ অবস্থান বলে মনে করছেন।

আয়োজক দেশ কানাডাকেও যুক্ত করা হচ্ছে এই কাকতালীয় গল্পে। কানাডা এর আগে মাত্র দুইটি বিশ্বকাপে খেলেছে—১৯৮৬ মেক্সিকো ও ২০২২ কাতার। এই দুই আসরেই আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক হিসেবেও কানাডা থাকায় সমর্থকদের বিশ্বাস আরও পোক্ত হচ্ছে।

ব্যক্তিগত পুরস্কারের ইতিহাসও জায়গা পাচ্ছে এই বিশ্বাসের তালিকায়। ১৯৮৫ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ফরাসি তারকা মিশেল প্লাতিনি, পরের বছরই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে। ২০২২ সালে ব্যালন ডি’অর পান করিম বেনজেমা, আর একই বছরে কাতারে শিরোপা তোলে আর্জেন্টিনা। ২০২৩ সালে এই পুরস্কার গেছে আরেক ফরাসি উসমান দেম্বেলের হাতে—যা অনেকের চোখে ২০২৬-এর আগে আরেকটি ইঙ্গিত।

ক্লাব ফুটবলেও মিল খোঁজা হচ্ছে। ২০২১ সালে ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছিল চেলসি, এরপরই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয় করে। ২০২৫ সালেও চেলসি সেই ট্রফি জিতেছে, যা সমর্থকদের কাছে আগের চক্রের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে।

এ ছাড়া আলোচনায় আছে ‘১২ বছরের নিয়ম’। ইতালি ১৯৯৪ সালে ফাইনাল হেরে ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়, জার্মানি ২০০২ সালে ফাইনাল হেরে ২০১৪ সালে শিরোপা জেতে। আর্জেন্টিনা ২০১৪ সালে ফাইনাল হেরেছিল, আর ১২ বছর পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬-এ। এমনকি বয়সভিত্তিক ফুটবলও এই বিশ্বাসের অংশ—১৯৮৩ সালে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দল ফাইনাল হেরে যায়, পরের বিশ্বকাপে সিনিয়র দল চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০২৫ সালেও অনূর্ধ্ব-২০ দল ফাইনালে হেরেছে, ঠিক ২০২৬ বিশ্বকাপের আগের বছর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত