আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি, পল্লীকবি খ্যাত জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। কবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও জসীম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও কবর জিয়ারতের পর আলোচনাসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, গ্রামের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন আর সোঁদা মাটির ঘ্রাণের অকৃত্রিম জীবন গাথাকে তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার সাহিত্য রচনায়। এ কারণে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিমান কবি হয়েও তিনি ‘পল্লীকবি’ মর্যাদায় ভূষিত। তিনি বাংলা কবিতা ও পল্লী গানের অন্যতম প্রাণপুরুষ।
কবি জসীমউদ্দীন১৯০৩ সালে ১ জানুয়ারি সদর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আনসারউদ্দিন মোল্যা একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন এবং মায়ের নাম আমিনা খাতুন। তার পৈত্রিক বসতভিটা শহরের অম্বিকাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে অবস্থিত।
সাহিত্যবিশারদদের মতে, কবি জসীমউদ্দীন আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আধুনিক কবি। ঐতিহ্যবাহী বাংলা কবিতার মূল ধারাটিকে নগরসভায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব তারই। তার ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলা ভাষার গীতিময় কবিতার অন্যতম উৎকৃষ্ট নিদর্শন। তার কবিতা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সরকার সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীনকে ‘প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইড অব পারফরমেন্স’ প্রদান করে। ১৯৭৪ সালে তাকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলেও পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা হয়না বলে তিনি সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাখ্যান পত্রে কবি উল্লেখ করেছিলেন, তিনি আমৃত্যু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেবায় নিয়োজিত থাকতে চান, কিন্তু কোনো পুরস্কার বা পদক গ্রহণের জন্য তিনি প্রস্তুত নন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক এবং ১৯৭৮ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে বাংলা একাডেমি তার নামে কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করে।
১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে তার জন্মভূমি ফরিদপুর জেলার অম্বিকাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে কবির বাড়ির আঙিনায় অবস্থিত পারিবারিক কবরস্থানে ডালিম তলায় দাফন করা হয়। তার কালজয়ী কবিতা 'কবর'-এর স্মৃতিবাহী ডালিম তলা বর্তমানে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে কবির বাড়ি তার পারিবারিক কবর পরিদর্শন করতে আসেন।
কবি স্ত্রী বেগম মমতাজ জসীম উদদীন ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই দস্পতির ঘরে তিন ছেলে ও ২ মেয়ের জন্ম হয়। তাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র কামাল আনোয়ার হাসু ১৯৯০ সালের ৩ জুন মৃত্যুবরণ করেন। মেজ ছেলে ড. জামাল আনোয়ার একজন ভূবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র খুরশীদ আনোয়ার। এ ছাড়া বড়ো মেয়ে বেগম হাসনা মওদুদ একজন পরিবেশবিদ এবং লেখক। তার স্বামী ছিলেন বাংলাদেশের প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ছোট মেয়ে আসমা ইলাহী। তার স্বামী ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (বীর বিক্রম) সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন।
স্মৃতি সংরক্ষণে প্রতি বছর কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিস্থলে দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়াও তার পৈতৃক বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জসীমউদ্দীন জাদুঘর তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও স্মৃতি বহন করছে।
কবির স্মৃতি সংরক্ষণে তার বাড়ির অদূরে অম্বিকাপুরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অর্থায়নে ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৪ একর জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘পল্লীকবি জসীমউদ্দীন সংগ্রহশালা’।
