দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত গড়েছিলেন খালেদা জিয়া: মির্জা ফখরুল

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত গড়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার অবিচল নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা আর যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক নন, বরং বাংলাদেশের আধুনিক বাজারভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম রূপকার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় তিনি এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।

আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ ও দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন। 

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ এবং ব্যবসায়ীদের আরো ১৭টি সংগঠন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, অর্থনৈতিক খাতে খালেদা জিয়ার অবিচল নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা আর যুগান্তকারী দিকনির্দেশনা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ব্যক্তিখাত ও প্রাইভেটখাতে যে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন, তা বেগম খালেদা জিয়া ধারণ করে নিয়েছিলেন। তিনি ধনী-দরিদ্র কারো কথা ভুলে যাননি। সবাইকে নিয়ে সকলের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন।

খালেদা জিয়া প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা দূরে রেখে সবাই মিলে ঐক্য ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের বার্তা দিয়েছেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, বেগম খালেদা জিয়া আমাদের কাছে সত্যিকার অর্থেই একজন আইকন। এই নেত্রীর মধ্যে সাধারণ মানুষগুলো বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছিল। তাদের ভবিষ্যৎকে দেখতে পেয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। তিনি কষ্ট করেছেন, জেলে গেছেন। আমি তার কোনও তুলনা খুঁজে পাই না। কারণ, তিনি একদিকে ছিলেন একজন রাজনৈতিক দলের নেত্রী। আবার একাধারে ছিলেন গোটা জাতির নেত্রী। তিনি কখনো সংকীর্ণতায় ভুগতেন না।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার যে কাজ, তার যে রেখে যাওয়া স্বপ্ন, সেগুলোকে আমাদের বাস্তবায়িত করতে হবে।

এ সময় খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা কবি আল মাহমুদের কবিতা ‘তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছে বাংলার ভোরের আকাশ’ আবৃত্তি করে শোনান তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি— বেগম খালেদা জিয়া প্রাইভেট সেক্টর এবং পাবলিক সেক্টরের মধ্যে ‘ইউনিক কম্বিনেশন’ সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ, উনার (খালেদা জিয়া) সময় আমার কিছুদিন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছিল। তখন তাঁর কাছ থেকে আমি সমাজ বির্নিমাণের আধুনিক সব নির্দেশনা পেতাম।

বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ধনী-দরিদ্র কারো কথা ভুলে যাননি। সবাইকে নিয়ে সকলের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে দেশকে তিনি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজকে বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তিনি আপসহীন ও নীতির রাজনীতি সৃষ্টি করে গেছেন। তার ওপর জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচার হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জিয়াউর রহমান ব্যক্তিখাত ও প্রাইভেটখাতে যে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন, তা বেগম খালেদা জিয়া ধারণ করে নিয়েছিলেন। দেশের অর্থনীতিকে তাঁরা এগিয়ে নিয়েছিলেন।

শুধু গণতন্ত্রে নয়, অর্থনীতিতে বেগম জিয়ার অবদান ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন মাল্টিসেক্টরে। বেগম জিয়ার বৈদেশিক নীতি দেশকে নিয়ে গেছে সবার কাছে।

তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর ৮ থেকে ৯ বছর আগে বেগম জিয়া দেশ-রাষ্ট্র সংস্কারের রুপরেখা  ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছিলেন। তখন কেউ সংস্কারের কথা মাথায় আনেনি। তারপর তারেক রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ দফা দেওয়া হয়েছিল। যেখানে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কীভাবে দাঁড় করানো যায়, সে বিষয়ে ইউনিক সব পরিকল্পনা রয়েছে।

আমীর খসরু বলেন, যে বিষয়গুলো প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া হবে। শুধু মুক্ত বাজার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকেই অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়া সমান গুরুত্ব দিয়েছেন।

এর আগে স্বাগত বক্তব্যে আইসিসি-বি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জটিল রাজনৈতিক উত্তরণের সেই সময়ে তাঁর ভূমিকা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ১৯৯০-এর দশক এবং ২০০০-এর শুরুর দিকে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়ন এগিয়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য হাসে সহায়তা করে।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের বিকাশে খালেদা জিয়ার অবদান তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের আরো সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নীতিমালা গ্রহণ করেন, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরো সুদৃঢ় করে।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের এক আপসহীন ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কেবল গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক নন, বরং বাংলাদেশের আধুনিক বাজারভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম রূপকার। ১৯৯১ সালে দায়িত্ব গ্রহণকালে স্থবির ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধ অর্থনীতিকে সচল করতে তিনি মুক্ত বাজার, বেসরকারি খাতনির্ভর উন্নয়ন, উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণ করেন। ভ্যাট আইন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজস্ব, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার অবদান ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন আপসহীন নেত্রী এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার অসামান্য অবদানের জন্য এ দেশের মানুষ তাকে চিরকাল মনে রাখবে। তবে, একজন ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে আমি তাকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে তার অবিচল নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা আর যুগান্তকারী দিক-নির্দেশনার জন্য। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির যে লাইফলাইন বা তৈরি পোশাক শিল্প, তার এই আজকের এই বিশালত্বের পেছনে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের শিল্পবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। আমরা বিজিএম-এর পরিবার তার সরকারের কাছে বিশেষভাবে ঋণী।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী বলেন, বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের নীতিকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন— উদ্যোগ, বিনিয়োগ এবং কঠোর পরিশ্রমই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল শক্তি।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক দেশনেত্রী, আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পোশাক শিল্প পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। তিনি কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। উনার কাছে আমরা যতবারই গিয়েছি, উনি সমস্যা শুনেছেন এবং পরবর্তীতে সেটা কার্যকর সমাধান দিয়েছেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যে প্রসার, সেটা তার দায়িত্বকালেই হয়েছিল।

ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ সালে ওষুধ শিল্পের জন্য যে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার ফলস্বরূপ আজ শিল্প এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত