সিজিএস সংলাপে বক্তারা

সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলা যায় না— এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা। তারা বলেন, একটি গণতন্ত্রের মান নির্ধারিত হয় সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কতটা নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্ত বোধ করে, তার ওপর।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এসব কথা বলা হয়। 

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু অধিকার ও নির্বাচনী অঙ্গীকার পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। নির্বাচনের আগে দলগুলোর স্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা এবং নির্বাচনের পর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, সংখ্যালঘু পরিচয় কাউকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী যেভাবে নিজেদের পরিচয় দিতে চায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নাগরিক যদি নিজের দেশেই আগে নিরাপত্তার কথা ভাবতে বাধ্য হয়, তাহলে অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে। নির্বাচনী সময়ে ভোটাধিকার ও নিরাপত্তার মধ্যে যেন কাউকে বেছে নিতে না হয়— এটি রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব।

সুজন এর সেক্রেটারি ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্র সভ্য হয় না। তিনি বলেন, ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভয়মুক্ত ভোট প্রদান ও স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়াই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি। নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি চুক্তি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) এর মহাসচিব মোমিনুল আমিন বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমাজের সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব অপরিহার্য।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য সাঈদ ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশকে কেবল বাঙালির রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করলে অবাঙালি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তিনি জানান, নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আস্থার ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা।

ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও জেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম বলেন, ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি দিয়ে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব নয়। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বাস্তবসম্মত নীতি, স্পষ্ট রূপরেখা ও দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। কেবল আশাবাদী ভাষা যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেরা যদি বলতে পারে তারা নিরাপদ ও সমঅধিকারভুক্ত, তবেই বাংলাদেশকে প্রকৃত উন্নত রাষ্ট্র বলা যাবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী, আহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সল, এস. এম. শামীম রেজা, শেখ ফজলে বারী মাসুদ, শিহাব উদ্দিন খান, সুব্রত চৌধুরী, তাসলিমা আক্তার ও উজ্জ্বল আজিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

বক্তারা একমত পোষণ করে বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং বাস্তবায়নযোগ্য রাজনৈতিক অঙ্গীকারই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত