বিনিয়োগে ধস, ১০ বছরে সর্বনিম্ন এডিপি

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ধস নেমেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সিন্ডিকেটের কারণে বাড়ছে চালের দাম। কর্মসংস্থান বাড়েনি। এ অবস্থায় দেশের এই ভঙ্গুর অর্থনীতির গতি ফেরাতে নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি করা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়নে সংস্কার কাজ অব্যাহত রাখা।

‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৫-২৬ : নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। গতকাল শনিবার ঢাকার ধানম-িতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নিজস্ব কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনে করেছে। অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ। 

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ২০২৩ সাল থেকে উচ্চমূল্যস্ফীতি বজায় রয়েছে যা লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমেছে। তবে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ। সুতরাং খাদ্যের মূল্য কিছুটা কমলেও অন্যান্য পণ্যের দাম বেশি।’

সরকারি তথ্যমতে, চালের চাহিদা ৩১ মিলিয়ন টন আর উৎপাদন ৪৪ মিলিয়ন টন। তবুও দাম বাড়ার কারণ হিসেবে প্রবন্ধে বলা হয়, ‘চালের উৎপাদন খরচ ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বড় কারণ। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ৪০ শতাংশ কমেছে, কিন্তু আমাদের দেশে কমছে না। চিনি ও তেলের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আমাদের দেশে কমছে না।’

দেশে অর্থনৈতিক গতি মন্থর বিষয়টি উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার সাড়ে ১১ শতাংশ। বড় বড় মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়ন হার অনেক কম সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ইত্যাদি। আবার বাজেট ঘাটতি নিয়ে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অনুদান বাদে বাজেটে উদ্বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। ওই সময়ে বাজেট উদ্বৃত্তের পরিমাণ ১২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ধীরগতিই ওই উদ্বৃত্তের প্রধান কারণ। বেসরকারি বিনিয়োগও ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

বর্তমান বাস্তবতায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে মূল বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা থাকে সেটা অর্জন করতেই এনবিআরকে হিমশিম খেতে হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১৬.৭ শতাংশ হলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ১৫.০২ শতাংশ। এনবিআরকে যদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, তাহলে বাকি সময়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান বাস্তবতায় খুবই কঠিন হবে।’

সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে আগামী সরকারের ঝুঁকিগুলোর বিষয়ে ফাহমিদা বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের অর্থায়নে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এবং সুদের হারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে সরকার ৫টি দুর্বল ইসলামি ব্যাংককে একত্র করতে গিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ‘পেইড অব ক্যাপিটাল’ দিয়েছে। আবার বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধ করতে হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি সামনের গ্রীষ্মের লোডশেডিং কমাতে হয়, তাহলে ওই টাকা পরিশোধ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল চলতি অর্থবছরে ‘হয়তো’ বাস্তবায়ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকারকে চাপের মুখে পড়তে হবে। ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। নির্বাচনপরবর্তী নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরি করা।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়বে। সমাজে যদি ন্যায়সংগত সুযোগ না থাকে, তাহলে একদিকে বৈষম্য তৈরি হয়, অন্যদিকে অস্থিরতা দেখা দেয়। উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে আন্দোলন হয়, তার পেছনেও এই বাস্তবতা কাজ করেছে। বাজারে চাকরি নেই, সরকারি চাকরিই একমাত্র ভরসা, সেখানেও কোটা-সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চমূল্যস্ফীতি। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল।’

নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নির্বাচন পরিচালনা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হোক এটা প্রত্যাশা। নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি যেন না হয়, অর্থের অপব্যবহার যেন না হয়, সে জন্য নীতিমালা আছে। প্রত্যেক প্রার্থীকে তা মানতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন যেন সহিংসতামুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেন।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে। জাতীয় বাজেটের প্রধান খাত এখন ঋণের সুদ পরিশোধ। এই চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে, এমন ঝুঁকি আছে।

আগামী সরকারের জন্য সুপারিশ : অর্থনীতির এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পরমর্শ ও সুপারিশ জানিয়েছে সংস্থাটি। সিপিডি বলছে, রাজস্ব বাড়াতে ডিজিটাল অর্থনীতি, সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর কার্যকর কর আরোপ জরুরি। বাস্তব বাজারমূল্যের ভিত্তিতে সম্পত্তি কর হালনাগাদ করে এনবিআরের সম্পদ করের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে অকার্যকর করছাড় ও অব্যাহতিগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে এবং খেয়ালখুশি মতো কর সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক প্রবাহ রোধে নীতিগত ও বাস্তব প্রয়োগ উভয় পর্যায়ে কর কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

ব্যাংক ও জ্বালানি খাত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ঋণখেলাপি কমাতে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন বাস্তবায়ন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, দেশীয় অনুসন্ধান জোরদার ও এই খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং প্রবাসী আয় ধরে রাখার কৌশল ছাড়া ভবিষ্যৎ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত এই পদক্ষেপগুলো যদি প্রয়োগ করে সঠিক পথে বাংলাদেশ এগুতে পারে তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত