গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে নির্বাচন আর শুধু ব্যালট বাক্স, ভোটকেন্দ্র বা পোস্টার-মাইকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সমানভাবে সংঘটিত হচ্ছে ফেসবুক টাইমলাইন, ইউটিউব ভিডিও, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, টিকটক রিলস ও মেসেঞ্জার চ্যাটে। এই ডিজিটাল পরিসরেই নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে এক ভয়ংকর হুমকি-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত গুজব, ভুয়া ভিডিও ও সংগঠিত অপপ্রচার।
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এই হুমকি ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এআইচালিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট, বট ও তথাকথিত ‘এআই এজেন্ট’-এর ঝাঁক। এরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করছে এবং নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
গুজব ও অপপ্রচার রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু এআই এই পুরোনো কৌশলকে দিয়েছে ভয়ংকর গতি, ব্যাপ্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, অডিও ও ছবি এতটাই বাস্তবসম্মত যে সাধারণ নাগরিকের পক্ষে এগুলো সত্য না মিথ্যা—তা আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক নেতার কণ্ঠ নকল করে বক্তব্য, কারও মুখ বসিয়ে দেওয়া ভিডিও, কিংবা সম্পূর্ণ বানানো ‘সংবাদ প্রতিবেদন’ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন আর শুধু প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয় বরং এটি এখন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কর্মী মারিয়া রেসা, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্যারি মার্কাসসহ বার্কলে, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ গবেষকরা এই হুমকিকে আখ্যা দিয়েছেন “ডেমোক্রেসির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ” হিসেবে।
মারিয়া রেসা বলেন-
“If we don’t stop AI-driven disinformation, democracy as we know it may not survive.” অর্থাৎ“এআইচালিত অপতথ্য যদি আমরা থামাতে না পারি, তবে আমরা যে গণতন্ত্রকে চিনি, সেটি টিকে থাকবে না।”
গবেষকরা ‘এআই সোয়ার্ম’ বা এআইয়ের ঝাঁক শব্দটি ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন এমন অসংখ্য কৃত্রিম অ্যাকাউন্ট, যারা সমন্বিতভাবে কাজ করে, নিজেদের মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি করে এবং মানুষের সামাজিক আচরণ নকল করে ধীরে ধীরে জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে এআই এজেন্টগুলো আর আগের দিনের সাধারণ বট নয়। এগুলো এখন মানুষের মতো ভাষা ব্যবহার করে, আঞ্চলিক শব্দ চেনে, আবেগ বোঝে এবং আলোচনার সুর অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অনলাইন কমিউনিটিতে মিশে থেকে মানুষের দুর্বলতা, ভয় ও পূর্বধারণা শনাক্ত করতে পারে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অপপ্রচার বিশেষজ্ঞ স্যান্ডার ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন-
“These AI agents don’t just spread lies; they manufacture false consensus.” অর্থাৎ “এই এআই এজেন্টগুলো শুধু মিথ্যা ছড়ায় না; তারা কৃত্রিম ঐকমত্য তৈরি করে।”
এর ফলে সাধারণ ভোটারের কাছে মনে হতে পারে—“সবাই তো এটাই বলছে”, অথচ বাস্তবে সেটি একটি পরিকল্পিত এআইচালিত প্রচারণা।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার দ্রুত, কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যাচাইয়ের সংস্কৃতি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক হয়নি। রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র। এসব মিলিয়ে এআই গুজবের জন্য বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক মাঠ।
এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন অভিযোগ তুলেছে—নির্বাচনকে সামনে রেখে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, ছবি ও বক্তব্য পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে।
গণসংহতি আন্দোলনের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এআই দিয়ে তৈরি প্রায় বাস্তবসম্মত কনটেন্ট ব্যবহার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, অথচ নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা এখনও দৃশ্যমান নয়।
এই অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।
এআই দিয়ে নির্বাচন বাতিলের ‘মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই গুজবের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি মানুষকে ধীরে ধীরে অগ্রহণযোগ্য বিষয় মেনে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। নির্বাচন বাতিল, ফলাফল প্রত্যাখ্যান বা সহিংসতা—সবকিছুর ক্ষেত্রেই এআইচালিত অপপ্রচার ভূমিকা রাখতে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার সামারফিল্ড বলেন—
“AI can shape what people consider normal or acceptable—very quietly, very effectively.” অর্থাৎ
“এআই নীরবে ও অত্যন্ত কার্যকরভাবে মানুষের কাছে কোনটি স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য—তা নির্ধারণ করে দিতে পারে।”
তাইওয়ান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া
২০২৪ সালে তাইওয়ান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচনে এআইচালিত অপপ্রচারের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে। তাইওয়ানের সাবেক ডিজিটাল মন্ত্রী অড্রে ট্যাং স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, স্বৈরাচারী শক্তিগুলো এআইকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে গণতান্ত্রিক সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করার জন্য।
তাইওয়ানের সংসদ সদস্য পুমা শেন জানিয়েছেন, এআই বটগুলো এমন তথ্য দেয় যেগুলো যাচাই করা যায় না, কিন্তু শুনতে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য। এতে ভোটাররা তথ্যের ভারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এসে পড়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর। শুধু বিবৃতি দিয়ে বা আশ্বাস দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। প্রয়োজন—
এআইচালিত কনটেন্ট শনাক্তে বিশেষ প্রযুক্তি টিম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমন্বয়।
দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য হটলাইন।
ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক ও সোয়ার্ম স্ক্যানারের ব্যবহার।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্পষ্ট আচরণবিধি ও কঠোর শাস্তির নজির।
ডেভিড গার্সিয়া, কনস্টানজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সতর্ক করে বলেছেন-
“Democracies lose not only when elections are rigged, but when trust is destroyed.” অর্থাৎ “গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন কারচুপির মাধ্যমেই হারায় না; আস্থার মৃত্যু ঘটলেও গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে।”
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয় বরং এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সম্মিলিত অঙ্গীকার। কিন্তু এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব অপরিহার্য। এআই গুজবকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এআই প্রযুক্তি থামানো যাবে না-কিন্তু এর অপব্যবহার ঠেকানো অবশ্যই সম্ভব। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সময় থাকতে সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত?
আগেও আমি বহুবার বলেছি যে, ত্রয়োদশ নির্বাচন শুধু একটি ভোটের দিন নয় বরং এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার মূল্য হবে ভয়াবহ। তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এআই গুজব প্রতিরোধ একান্ত অপরিহার্য।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক,ঢাকা।
[email protected]
