তারেক রহমানের কণ্ঠ এখন অনেকটাই ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করায় দেশের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতেও কিছুটা সময় লাগছে। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার মানুষের সম্ভাব্য একজন নেতার জন্য বর্তমান পরিস্থিতি আদর্শ নয়। তবে এই কণ্ঠ ভেঙে যাওয়ার এই উপমার এক ধরনের বৈপরীত্যও রয়েছে কেননা গত এক দশক ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমানের বক্তৃতা দেশের গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল।
রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।’ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বাগানবিলাস আর গাঁদা ফুলে সাজানো পরিবেশে বসে দেওয়া প্রথম কোনো সাক্ষাৎকারে তিনি এমনটাই বলেছেন। মুচকি হাসি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আসলে আমি খুব ভালো বক্তা নই। তবে কেউ যদি আমাকে কোনো দায়িত্ব দেয়, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি।’
গত কয়েক সপ্তাহ তারেক রহমানের জন্য ছিল ঘটনাবহুল। ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন, আর ঢাকার বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে রাতভর অপেক্ষা করা কয়েক লাখ সমর্থক জড়ো হয়। মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান। তার জানাজায় আরও বেশি মানুষ রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসে।
‘আমার হৃদয় খুব ভারাক্রান্ত,’ কথাটা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় তার। ‘কিন্তু আমার মায়ের কাছ থেকে আমি শিখেছি, দায়িত্ব পেলে তা পালন করতেই হয়।’ সে দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথেই হাঁটা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান স্পষ্টভাবেই এগিয়ে আছেন। ১৮ মাস আগে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তারেক রহমান নিজেকে উপস্থাপন করছেন এমন একজন নেতা হিসেবে যিনি একদিকে মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি, আর অন্যদিকে তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়তে পারেন।
আগামীতে বাংলাদেশের সমস্যা কম নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর দুর্বল মুদ্রার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতেও চলছে কড়াকড়ি—যা শিল্প ও জ্বালানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে হিমশিম খাচ্ছে। যুব বেকারত্ব ১৩.৫ শতাংশ। প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছে। নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করা এখন জরুরি।
তবে তারেক রহমান নিজেও বিতর্কমুক্ত নন। তার প্রধান পরিচয় পারিবারিক। তিনি খালেদা জিয়া ও মুক্তিযুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের সন্তান। ৬০ বছর বয়সী তারেক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বপূর্ণ দুই পরিবারের এক শাখার প্রতিনিধি। অন্য শাখায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা।
সমর্থকদের চোখে তারেক একজন নির্যাতিত নেতা, যিনি দেশে ফিরে জনগণকে উদ্ধার করতে এসেছেন। সমালোচকদের কাছে তিনি ক্ষমতালোভী, সুবিধাভোগী, অসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে জন্মসূত্রে রাজনীতিতে আসা এক ব্যক্তি। তারেক রহমান নিজে বলেন, তিনি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি বাবা-মায়ের ছেলে হিসেবে নয়, আমার দলের কর্মী-সমর্থকরাই আমাকে এখানে এনেছে।’
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, মানুষ তার কথায় বিশ্বাস রাখছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে করা জরিপ অনুযায়ী, বিএনপির সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ১৯ শতাংশ। তবু শঙ্কা আছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্কারপন্থীরা ভয় পাচ্ছেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গিয়ে নিহত প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর রক্ত হয়তো আরেক স্বার্থপর শাসকের জন্ম দেবে।
তারেক রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার বিরুদ্ধে থাকা আগের দণ্ডগুলো অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে। তিনি বলেন, ‘ওরা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’ এটা সত্য, হাসিনার আমলে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রায় অন্ধভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়েছে। আবার এটাও সত্য, তারেক রহমান সেই বংশগত সুবিধার অংশ যার বিরুদ্ধেই জুলাইয়ের বিপ্লব ছিল।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বড় অবদান রাখে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে যৌথ মহড়ায়ও অংশ নেয়। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে চীনও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।
আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে, তা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সহায়ক হবে। আর তারেক রহমানও দীর্ঘ নির্বাসনে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একজন পরিণত নেতা হয়ে উঠেছেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। তারেক রহমান বলেন, ‘যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের আনেক দায়িত্ব। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে যাতে মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।’
তারেক রহমানকে দেখা যায় শান্ত, অন্তর্মুখী মানুষ হিসেবে। তিনি বেশি কথা বলার চেয়ে শুনতে পছন্দ করেন। লন্ডনে থাকাকালে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে কিংবা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত আটবার দেখেছি।’
নীতিগত বিষয়েও তিনি যথেষ্ট প্রস্তুত। তিনি চান ১২ হাজার মাইল খাল খনন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক করতে, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগাতে, ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরি করতে। আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন, বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনাও আছে তার। তিনি বলেন, ‘আমি যদি আমার পরিকল্পনার ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’
এই প্রযুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি তার পুরনো ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হলেও দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। এরপর ব্যবসা ও রাজনীতিতে আসেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তার উত্থান যেমন দ্রুত ছিল, তেমনি বিতর্কিতও।
আজও অনেকের কাছে তিনি ‘খাম্বা তারেক’। অভিযোগ ছিল, বিদ্যুতের খুঁটি কেনার নামে দুর্নীতি হয়েছে। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ২০০৮ সালের একটি ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় তাকে ‘লুটেরা রাজনীতি ও সহিংসতার প্রতীক’ বলা হয়েছিল।২০০৭–২০০৮ সালে বাংলাদেশের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বহনকারী একটি বহরে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ মোট ৮৪টি অভিযোগ আনা হয়। এসব মামলায় তিনি ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। কারাগারে নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে জটিলতা তৈরি হয়, যার ভোগান্তি তিনি আজও বহন করছেন। মূলত চিকিৎসার জন্যই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। তিনি বলেন, শীতকালে ঠান্ডা পড়লে এখনো ব্যথা বাড়ে। কিন্তু আমি এটাকে জনগণের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে যেন আর কেউ এমন ভোগান্তির শিকার না হয়, সে জন্য আমাকে সর্বোচ্চটা দিতে হবে।’
২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন যাকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। সেই সময় থেকেই তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেই ভিডিও লিংকের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করেন।
এই সময়ের বড় একটি অংশজুড়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। ২০০৬ সালে যেখানে দেশের জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশকে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে পরিণত করে। তবে একই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দমন–পীড়ন ক্রমেই তীব্রতর হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ৩৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান রাজনীতিকরণ হওয়ায় সেনাবাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে। স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ করেন।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হয়ে ওঠে। জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয় সরকারপন্থীদের জন্য চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু শেখ হাসিনার অদূরদর্শী দমন–পীড়ন রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দেয়। এতে রাস্তায় নামেন কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক—হাজার হাজার মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে শেখ হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি এখনো সেখানে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে অবস্থান করছেন এবং ক্ষমতাচ্যুতি ও আসন্ন নির্বাচনে তার দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
টাইম ম্যাগাজিনকে হাসিনা বলেন, ‘ভোটারদের অবশ্যই বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার থাকতে হবে। বাংলাদেশে যতদিন সব বড় দলের অংশগ্রহণে প্রকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচন না হবে, ততদিন গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।’
তবে গণতন্ত্র ক্ষয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ তারেক রহমানের কাছে বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে সংঘটিত রক্তপাতের মাত্রা ছিল ভয়াবহ। সে সময় নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি ও পাথর হাতে থাকা বিক্ষোভকারীদের ওপর সাঁজোয়া যান চালায় এবং এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি ছোড়া হয়। তিনি বলেন, ‘এই দেশে অপরাধের জন্য আইন আছে, বিধান আছে। যে অপরাধ করবে, তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।’
নভেম্বরে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, শেখ হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে জানান, দলীয় সমর্থকদের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন আমরা হতে দেব না। আমাদের আন্দোলন আরও জোরালো হবে… শেষ পর্যন্ত সেখানে সহিংসতা ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে।’
এ ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটনে সমর্থন আদায়ে সহায়ক হবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনাগুলোকে আওয়ামী লীগ বাড়িয়ে তুলে ধরে দাবি করছে, দেশে উগ্র ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে। আওয়ামী লীগ এবং ভারতের কিছু প্রভাবশালী মহল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে। তারেক রহমান জানান, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন এবং বোয়িং উড়োজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো কেনার সম্ভাবনার মাধ্যমে শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন আমি দেখব আমার দেশের স্বার্থ। তবে আমরা একে অপরকে সহায়তাও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত মানুষ।’
জুলাইয়ের বিপ্লবের স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। দেয়ালচিত্রে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে শয়তানের শিং লাগানো অবস্থায়, চারপাশে লুটের টাকার বস্তা নিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে। নানা স্লোগান লেখা— ‘শেম অন বাংলাদেশি পুলিশ!’ এবং ‘এটা জেন-জিদের তৈরি নতুন বাংলাদেশ।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জুলাইয়ের পর মানুষ চেয়েছে ব্যবস্থার পরিবর্তন। বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র ও পুলিশ যেন স্বাধীন হয়।’ তিনি ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী। তারেক রহমানের বিষয়ে তিনি এখনো চূড়ান্ত মত দিতে চান না, তবে তার কার্যক্রমে ইতিবাচক দিক দেখছেন।
হাসনাত বলেন, ‘তারেক রহমান খুব ভালো করছেন। বিএনপির মতো একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়া খুবই কঠিন। তার পারফরম্যান্স নিয়ে এখনই মন্তব্য করা ঠিক হবে না, তবে এখন পর্যন্ত তিনি ভালোই করছেন।’
সংস্কারগুলো আদৌ কতটা সফল হবে, সে প্রশ্নেও এখনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। যেমন জুলাই বিপ্লবের গ্রাফিতিগুলো রোদে পুড়ে ফিকে হয়ে গেছে তেমনি ছাত্রদের বিজয়ের উচ্ছ্বাসও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের কারণে ম্লান হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে সব রাজনৈতিক দলকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, আর ইউনূসের নিজস্ব সরকারি অভিজ্ঞতা না থাকায় উদ্যোগটির নেতৃত্বে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও ঘাটতি ছিল। বিদ্রোহে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের বড় পরিসরে জায়গা দেওয়া হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির—নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের—নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী। কিন্তু লিঙ্গসমতার সুপারিশগুলো শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী দাবি করে ইসলামপন্থীদের অশালীন প্রতিবাদের মুখে কমিশনটি পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রস্তাবনাগুলো স্থগিত করে রাখা হয়।
তবে কিছু সাফল্যও ছিল। জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করে যে ১,৫৬৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৮৭ জনকে ‘নিখোঁজ ও মৃত’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়। (এদের প্রায় সবাই ছিলেন জামায়াত বা বিএনপির সদস্য।) সশস্ত্র বাহিনীর চাপ সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বিচার করা হচ্ছে বেসামরিক আদালতে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরও কিছুটা উন্মুক্ত হয়েছে। ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুবাশশার হাসান—যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে ৪৪ দিন বিচারবহির্ভূতভাবে আটক ছিলেন। সম্প্রতি তিনি সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনীতিকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নেন। তারপর বলেন, ‘এরপর আমি ঘরে ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। হাসিনার সময়ে এটা কল্পনাও করা যেত না।’
তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। আত্মঘাতী বিচার বা গণপিটুনির ঘটনা, দলবদ্ধ সহিংসতা, এবং বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনলাইন ডক্সিং উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় ১২ ডিসেম্বর, যখন ভারতের আশ্রয়ে শেখ হাসিনাকে রাখার তীব্র সমালোচক যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি ঢাকায় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর একটি জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগ করে, যেগুলোকে তারা নয়াদিল্লিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে বহু সাংবাদিক ছাদে আটকা পড়েন। ধারণা করা হয়, জুলাই বিপ্লবে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে জনরোষ এখনো কাটিয়ে উঠতে না পারায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী পুরোপুরি দায়িত্ব পালনে নিজেদের সক্ষম মনে করছে না।
তারেক রহমান বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে গিয়ে নিরাপদ বোধ করে।’
তবে ভবিষ্যতে যেন আবার এ ধরনের অপব্যবহার না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। নতুন নেতা বাছাইয়ের জন্য ভোট দিতে গিয়ে বাংলাদেশিরা একই সঙ্গে একটি গণভোটেও অংশ নেবেন, যেখানে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে—দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা চালু, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বণ্টন, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমিত করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রীয়াজ বলেন, ‘না ভোট এলে তা খুবই হতাশাজনক হবে। তাহলে দেশ এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারে, যেখানে আবার অতীতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।’
আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে, যদি দ্রুত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকগুলোর উন্নতি না ঘটে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে হওয়া কোনো নির্বাচনই কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু বলা যায় না।’ তবে আলী রীয়াজ এতে অনড়। তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি রাজনৈতিক দল, যারা এমন সব জঘন্য কাজ করেছে, যা মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল, অথচ তারা এখনো তার জন্য ক্ষমা চায়নি। তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; বরং তারা মানুষকে উসকানি দিচ্ছে।’
আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না—এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চান না তারেক রহমান। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি বলেন, ‘কারণ আজ যদি একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করা হবে না—এর নিশ্চয়তা কী? তবে অবশ্যই, কেউ যদি কোনো অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।’
রহমানের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হলেও বিপ্লবোত্তর সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন হলো ইসলামপন্থার পুনরুত্থান। বাংলাদেশ এমন এক ভাটায় রয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়েও বড় মুসলিম জনসংখ্যা বাস করে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এখানে বসবাস করে। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ১৯৮৮ সালে এক সামরিক শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। এই বৈপরীত্যই উগ্র মৌলবাদীদের বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
হাসিনার অসংখ্য ত্রুটি সত্ত্বেও তিনি উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন এবং এমনকি ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথম দিকের যে সিদ্ধান্তগুলো নেয়, তার একটি ছিল ইসলামপন্থী দল জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। বর্তমানে কৌশলী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে দলটি তরুণদের মধ্যে শক্ত সমর্থন গড়ে তুলেছে।
সেপ্টেম্বরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভূমিধস জয় পায়—যা বরাবরই জাতীয় রাজনৈতিক প্রবণতার সূচক হিসেবে বিবেচিত। আরও চারটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা জয়লাভ করে। এনসিপি জামায়াতকে সমর্থন দেওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ (মূলত নারী) এমন বহু নেতা দল ছাড়েন। প্রকাশ্যে সমকামী ও এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমান দলীয় রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়েন।
জামায়াতের সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলেও তারা সাম্প্রতিক সময়ে আগের তুলনায় কট্টর বক্তব্য নরম করেছে। দলটি নিজেকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ হিসেবে পুনরায় ব্র্যান্ডিং করছে, সামাজিক কল্যাণের ওপর জোর দিচ্ছে এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে। এমনকি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি আসনে তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক; তবে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি ধর্মীয় ভিত্তি থেকে আসা দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছেন। জানুয়ারির শুরুতে জামায়াতের নেতা প্রকাশ করেন যে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন—যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। তবে তারেক রহমান এতে উদ্বিগ্ন নন। তিনি বলেন, ‘মানুষ শুধু এমন এক গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায়, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে।’
ক্ষমতায় যে–ই আসুক, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা হবে অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ার এই পরাশক্তি দ্বারা বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ফলে বাংলাদেশি পণ্যের স্থলপথে পরিবহনের প্রধান রুট ভারত, পাশাপাশি তুলা, খাদ্যশস্য, জ্বালানি, শিল্প উপকরণ ও বিদ্যুতের মতো আমদানির বড় উৎসও দেশটি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে। তারপর আমরা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।’
ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণা জোরদার করার ফলে তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান ‘খলনায়ক’ হয়ে উঠেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘তারেক রহমানের মতো একজন ব্যক্তিও প্রকাশ্যে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আহ্বান জানালে তার পক্ষে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
এটি গভীর প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র এবং ৩,৮০০–এর বেশি ভারতীয় সেনার প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন দিয়েছিল। তবু আজকের তরুণ বাংলাদেশিদের কাছে জামায়াত মানে ‘অদুর্নীতিগ্রস্ততা’, আর ভারত মানে ‘মরণশত্রু’।
এই অতীত থেকে বিচ্ছিন্নতা দেখায় যে তারেক রহমান তার পারিবারিক উত্তরাধিকারকে ভরসা করে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিরা অর্ধশতাব্দী আগের বীরত্বগাথায় আগ্রহী নন; তারা মরিয়া হয়ে এমন একজন নেতাকে চান যিনি শোনেন, সেতুবন্ধন গড়েন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য জরুরি স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাস জাগাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলতে থাকলে, ক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী হাসিনার শাসনামলকে আরও সহানুভূতির চোখে দেখতে পারে। ‘বংশানুক্রমিক দলগুলোকে কখনোই পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া যায় না,’ বলেন কুগেলম্যান। তিনি উল্লেখ করেন, মাত্র দুই বছর আগেও বিএনপিকে বিলুপ্ত প্রায় মনে করা হচ্ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও শেষ হয়ে যাননি। এখন তিনি প্রভাবশালী নন, কিন্তু ভবিষ্যতে তাকে একেবারে বাদ দেওয়া যায় না।
দুর্নীতির প্রভাব সম্পর্কে তারেক রহমান সচেতন হলেও, বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে বিএনপির হাজারো নিম্নস্তরের ক্যাডার যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছে এবং এখন মনে করে তাদের ‘ফায়দা তোলার’ অধিকার অর্জিত হয়েছে। তাতে দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
তবে এমন ইঙ্গিতও আছে যে তারেক রহমান অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। মে মাসে তিনি নিজের ও তার মায়ের কার্টুন পুনঃপোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘নির্ভীক ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদনকে সম্মান করা জরুরি, এমনকি তা আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে না মিললেও।’ খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনার আমলে তার প্রতি করা আচরণের নিন্দা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকেন; বরং ঐক্যের আহ্বান জানান। হাসিনার ‘আয়রন লেডি’ ভাবমূর্তির বিপরীতে, রহমানের ভাবমূর্তি ইচ্ছাকৃতভাবেই নরম। যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার পর তার পোষা বিড়াল জেবু সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।
লন্ডনের জীবনের কোন জিনিসটি সবচেয়ে মিস করেন জানতে চাইলে এক মুহূর্তও না ভেবে তিনি বলেন, ‘আমার স্বাধীনতা।’ বাড়ির চারপাশে ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘এই নিরাপত্তায় আমার দম বন্ধ লাগে। পাড়ার দোকানে হেঁটে যাওয়া বা হঠাৎ লেক্সাস চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে গিয়ে বেন নেভিস থেকে নামার সময় মেয়ে জাইমাকে চমকে দেওয়ার দিনগুলো আর নেই।’
তবু অভিযোগ নেই তার কণ্ঠে। ফিরে আসাটা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, এটা দায়িত্ববোধের ফল। একটি সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করেন তারেক রহমান বলেন, ‘মহাশক্তির সঙ্গে আসে মহান দায়িত্ব, আমি সত্যিই সেটা বিশ্বাস করি।’
