আধিপত্যবাদ ধীরে অগ্রসর হয়

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে, ইরান এক অনন্য অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং ইরান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা-কাঠামোর একটি মূল স্তম্ভ। বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যে ইরানের অবস্থান এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর পতন মানে শুধু একটি দেশের পতন নয়, বরং তা হবে একটি সম্পূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি-কাঠামোর পুনর্বিন্যাস। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান যে স্বাধীন ও স্বনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে, তা মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্যবাদের বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইরান শুধু নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে না বরং ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরাকের মতো দেশের প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্যও একটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। এই কারণেই পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল, ইরানকে তাদের আধিপত্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখে। ফলে ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা, তা নিছক কোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়; এটি বিশ্বরাজনীতির গভীর এক সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নানা ধরনের হুমকি-ধমকি সত্ত্বেও যখন ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা যাচ্ছে না, তখন ওয়াশিংটন ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা, বিভিন্ন জাতিগত বিদ্রোহ উসকে দেওয়া এবং মিডিয়ার মাধ্যমে ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর মতো কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফলাফল না দেওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর স্পষ্ট প্রমাণ হলো, পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন। ক্যারিয়ার গ্রুপগুলোতে রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্রুজ মিসাইল, ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার বিমান ঘাঁটিগুলোতে অতিরিক্ত ফাইটার জেট এবং বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সব কিছুই ইঙ্গিত করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ব্যাপক সামরিক আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরান ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো আক্রমণের মুখে তারা শুধু নিজেদের রক্ষাই করবে না, বরং পাল্টা আক্রমণ করবে যা পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের আগুনে পোড়াতে পারে।

ইরান আজ আমেরিকার মাথাব্যথার মূল কারণ হয়ে উঠেছে তার দুর্ভেদ্য অবিচলতার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিকল্পিত নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে ইসরায়েল কেন্দ্রবিন্দু এবং আরব রাষ্ট্রগুলো তার সহযোগী ভূমিকায়, ইরান সেখানে একমাত্র শক্তি, যে এই কাঠামো মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরান শুধু নিজে মানেনি, বরং লেবাননে হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনে প্রতিরোধ আন্দোলন, ইয়েমেনে হুথি এবং ইরাকে প্রতিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে একটি বিকল্প শক্তির বলয় তৈরি করেছে। এই বলয়ই ইসরায়েলের ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বারবার। এই কারণেই ইরানকে দুর্বল করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এক বিরাট কৌশলগত বিজয় হতে পারে। ক্ষোভ ছিল, আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র ভাঙেনি। বরং প্রতিবারই ইরান আরও বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এই ব্যর্থতার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বিকল্প কমে এসেছে। এখন সামরিক অভিযানই যেন তাদের শেষ অস্ত্র! পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন, আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা, মিত্রদের সঙ্গে যৌথ মহড়া সব মিলিয়ে একটি বড় সংঘাতের প্রস্তুতি স্পষ্ট। ইরান যে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বাইরে গিয়ে একটি বিকল্প রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে, সেটিই তাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ‘অপরাধ’।

ইরান ভেঙে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলাবে এ কথা নিশ্চিত। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিবর্তন হবে মুসলিম বিশ্বের মনস্তত্ত্বে। তখন একটি ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রগুলো আত্মরক্ষার বদলে আত্মসমর্পণের নীতি বেছে নেবে। নিজেদের জনগণের স্বার্থ নয়, বরং পরাশক্তির সন্তুষ্টিই হয়ে উঠবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। এটি শুধু রাজনৈতিক পরাজয় নয়; এটি একটি সভ্যতাগত পশ্চাৎপসরণ। এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বঅর্থনীতিতেও ভয়াবহ রূপ নেবে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। কিন্তু এসব ক্ষতির দায় কেউ নেবে না। বরাবরের মতোই যুদ্ধের মূল্য দেবে সাধারণ মানুষ, অথচ সিদ্ধান্ত নেবে ক্ষমতাধররা। ইতিহাস বলে, বিভক্ত মুসলিম বিশ্ব বরাবরই বহিরাগত শক্তির জন্য সহজ লক্ষ্য হয়েছে। আজ যদি ইরানকে একা ফেলে দেওয়া হয়, কাল কোনো রাষ্ট্রই আগ্রাসনের বাইরে থাকবে না। কারণ আধিপত্যবাদ সবসময় ধাপে ধাপে এগোয়। ইরানের মিত্ররা ইরানকে কতটুকু সাহায্য করবে, তা নিশ্চিত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবেগে চলে না; চলে স্বার্থে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই মুসলিম দেশগুলোর উচিত নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা। কূটনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে অন্তত একটি যৌথ অবস্থান নেওয়া জরুরি। নইলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সবাইকেই জবাবদিহি করতে হবে। এই মুহূর্তে ইরানকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি রাষ্ট্রকে রক্ষা করা নয়; এটি একটি ভারসাম্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। এই ভারসাম্য ভেঙে পড়লে বিশ্বরাজনীতি আরও নিষ্ঠুর, আরও একমুখী এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। শক্তির দম্ভ তখন আর কোনো সীমা মানবে না। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তা শুধু ইরানকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। ইরানের পর পরবর্তী টার্গেট হবে অন্য মুসলিম দেশগুলো, একে একে সবাই। এই পরিস্থিতিতে ঐক্য এবং সংহতিই হলো একমাত্র পথ। মুসলিম দেশগুলোকে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: শিক্ষক ও  কলাম লেখক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত