বনের সবচেয়ে বড় শালগাছটার চূড়ায় এক কাক বসে থাকে। গাছটা এমন উঁচু যে, দুপুরে তার ছায়া পড়ে নদীর পাড় পর্যন্ত। কাকটা সেখানে বসেই সারা দিন চেঁচায়, ডানা ঝাপটায়, ডাল নাড়িয়ে নাড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। যেন না চেঁচালে কেউ তাকে দেখবে না, শুনবে না।
‘আমি গতকাল আকাশ ছুঁয়েছি!’
‘ঝড়ের রাতে আমি একাই এই বন পাহারা দিয়েছি!’
‘আমার জন্যই গত বছর আগুন ছড়ায়নি!’
কাকের গলার স্বর ভারী, আত্মবিশ্বাসে ভরা।
সে এমনভাবে কথা বলে যেন সব সত্যের একমাত্র দাবিদার সে একা।
নিচে মাটির কাছাকাছি, গাছের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে থাকে এক পিঁপড়ে। ছোট, প্রায় চোখে পড়ে না। সে বেশি কথা বলে না। হাঁটে, দেখে, কাজ করে। যা দেখেনি তা বলে না, আর যা দেখেছে তা বাড়িয়ে বলে না।
তার জীবন চলে নীরবে, কিন্তু সতর্কতায়।
একদিন সকালে বনে অদ্ভুত একটা গুঞ্জন ছড়াল।
নদীর ধারে যারা থাকে, তারা কেউ কেউ পানি আনতে গিয়ে ফিরে এসেছে আতঙ্ক নিয়ে।
‘নদীর পানি বিষাক্ত!’
‘পানি খেলেই অসুস্থ হচ্ছে!’
‘কে যেন বলেছে, যে গেছে, সে আর ফেরেনি!’
এই গুজব আরও জোর পায় যখন কাক শালগাছের মাথা থেকে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘হ্যাঁ! আমি নিজে দেখেছি। নদীর পানি কালো হয়ে গেছে। একবার নামলেই শেষ। আর খুঁজে
পাওয়া যায় না।’
তার কথা শোনার লোক কম নয়। বনের অনেক প্রাণী কাককে গুরুত্ব দেয়।
কারণ সে উঁচুতে থাকে, জোরে কথা বলে, আর সব বিষয়ে আগেই মন্তব্য করে।
খরগোশ তার বাচ্চাদের ঘরে আটকে রাখে।
বানররা নদীর ধারে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।
এক বৃদ্ধ মহিষ, দূর থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তার গলা শুকিয়ে আসছে।
পিঁপড়ে তখন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
তার গলায় কোনো উত্তেজনা নেই।
সে বলে, ‘আমি আজ সকালে নদী পেরিয়ে এসেছি। পানি স্বাভাবিকই ছিল। এখনো স্বাভাবিকই আছে। নদীর পানি কালো হয়নি। স্বচ্ছ কাচের মতো টলমলে দেখেছি।’
তার কথা বাতাসে মিলিয়ে যায়। কেউ গুরুত্ব দেয় না।
কেউ কেউ হাসে, তুমি এত ছোট, তুমি কী বুঝবে? কী
করে এত খবর জানবে? তুমি তো নিচে থাকো, ওপরে কী হচ্ছে জানো না।
পিঁপড়ে চুপ করে যায়।
সে জানে, সত্য অনেক সময় চেঁচিয়ে বলতে হয় না।
শুধু অপেক্ষা করতে হয়।
কিন্তু সময় অপেক্ষা করে না।
দুপুর গড়াতে গড়াতে বনে পানির কষ্ট বেড়ে যায়।
পাখিদের ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে যায়।
এক মা হরিণ তার ছানাকে শান্ত করতে পারছে না।
দুধ নেই, পানি নেই।
অবশেষে সাহস করে হরিণটা নদীর দিকে যায়।
সবাই দূর থেকে তাকিয়ে থাকে, ভয়ে, উৎকণ্ঠায়।
হরিণ নদীর ধারে গিয়ে প্রথমে গন্ধ শোঁকে, তারপর এক চুমুক পানি খায়।
কিছু হয় না।
আরেক চুমুক খায়।
তারপর ফিরে এসে বলে, আমি নদীর পানি খেলাম। কিছুই হয়নি।
বনের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।
সবাই তখন পিঁপড়ের দিকে তাকায়।
কাক শালগাছের মাথায় বসে থাকে চুপচাপ। ডানা আর নাড়ে না। গলা দিয়ে আর শব্দ বেরোয় না।
পরে জানা যায়, নদীর পানির কালো রঙটা ছিল পাহাড়ি মাটির ধসের কারণে।
সাময়িক, ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কাক সেটা না জেনে, না দেখে, নিজের ভয় আর গুরুত্ব ধরে রাখতে গুজব ছড়িয়েছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় বনের বাতাস হালকা নড়ে।
পাতা ঝুলে থাকে।
খড়ের গন্ধ আর নদীর ঠান্ডা হাওয়া মিশে যায়।
পিঁপড়ে আবার তার পথে হাঁটে নীরবে, স্থির পায়ে।
কেউ তাকে বাহবা দেয় না।
কিন্তু অনেকেই মনে রাখে, বড় গলায় বলা কথা সবসময় সত্য হয় না। আর ছোট কণ্ঠের সত্য উপেক্ষা করলে, তার মূল্য দিতে হয় সবাইকে।
