আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট প্রদান করবেন। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি রাষ্ট্রের চরিত্র সংস্ক্রারের গণভোটের জন্য। বিষয়টি সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন ও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সারা দেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা শেষ করলেও মানিকগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে এর তেমন প্রভাব পড়েনি।
মানিকগঞ্জে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ইমাম সম্মেলন করেও উপজেলা অধিকাংশ ভোটার এখনো জানেন না যে, ভোটের দিন তাদের হাতে দুটি আলাদা ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রচাারিত স্লোগান, ‘এক ব্যালেটে দেব প্রার্থীকে ভোট, অন্য ব্যালেটে হবে গণভোট’, ‘সাদা ব্যালেটে প্রার্থীর ভোট, গোলাপি ব্যালেটে গণভোট।’ এই বার্তা মানিকগঞ্জ জেলার গ্রামীণ ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে এখনও পৌঁছেনি।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে গণভোটকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণা চললেও সচেতনতার অভাবে সংস্কার ও পরিবর্তনের যে ঐতিহাসিক সুযোগ জনগণের হাতে তুলে দেওয়ার কথা, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মীও গণভোটের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানেন না বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ উঠেছে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ জেলার ৬৫টি ইউনিয়ন, দুটি পৌরসভা এবং ৭টি উপজেলা প্রশাসন গণভোট নিয়ে সচেতনতনা মুলক ব্যানর ফেস্টুন দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে এসব প্রচারণা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নিকট পৌঁছাচ্ছে না। ফলে শহরের মানুষ তুলনামূলকভাবে সচেতন হলেও গ্রামীণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো জানেন না গণভোট কী, কেন এটি হচ্ছে কিংবা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী।
সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদের গিয়ে দেখা যায়, বড় বড় ব্যানার সাটানো হয়েছে গণভোট নিয়ে। কিন্তু এতে গণভোট সম্পর্কে তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রচারণা নেই। পরিষদ চত্তর ১০০ গজের সামনেই সাইফুলের চায়ের দোকান। বুধবার সকাল ১১টার দিকে কথা হয় সাইফুলের সাথে। গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করলে, উত্তরে তিনি বলেন, গণভোট বুঝি না। তবে এমপি পদে ভোট টা মেলা বছর পর এবার দিব। ফলে জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গ্রামীণ ভোটারদের অধিকাংশই জানেন না।
সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগানে গণভোটকে সামনে রেখে আমি প্রথমে আমার দপ্তর প্রধান, পরে আমার ৯টি ইউনিয়ন, সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে জনসচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছি। তাছাড়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দিয়ে উদ্ব্ধু করণ সভায় যোগ দেন।
মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, এই গণভোটের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনের কাঠামো, বিরোধীদলের ভূমিকা, সরকারের মেয়াদ, মৌলিক অধিকার, ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নীতিমালা এবং সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ফলে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীল আলম বিশ্বাস বলেন, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে একাধিক সভা সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গণভোট নিয়ে মানিকগঞ্জে ইমাম সম্মেলনে জেলার ৭৫০ শতাধিক ইমাম যোগদান করেন। ধর্মীয় নেতাদের বলা হয়েছে আপনারা মসজিদে খুৎবার সময় সাধারণ মানুষকে গণভোট নিয়ে ধারণা দিবেন। কিন্তু কাউকে কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে ন।
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে একাধিক অটোরিকশা চালকদের সঙ্গে কথা হয়, আমরা শুধু এমপি ভোটের কথাই জানি। গণভোট কী বা কেন দুইটা ব্যালট দেবে কেউ বলেনি।
মানিকগঞ্জ পৌর মার্কেটের মুরগি বিক্রেতা মিলন জানান, সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে জানলেও গণভোট সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই। শুনছি মেলা বছর আগে হ্যাঁ-না ভোট হয়ছিল। এখন নাকি মেলা কথা কয়। অত বুঝি না।
সাটুরিয়া সৈয়দ কালুশাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান মুক্তি বলেন, গণভোট আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হ্যাঁ ভোটে রাষ্ট্রের চরিত্র সংশোধন করা যাবে। এতে আর কোনও সরকার স্বৈরশাসক হতে পারবে না। ইন্টারনেট সহজে বন্ধ করতে পারবে না। এক ব্যক্তি দুইবারে বেশী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে যারা চাকরি করেন, তারা কিছুটা জানলেও গ্রাম কেন শহরের অনেক মানুষ এখনও সচেতন নয়।
মানিকগঞ্জ রিটার্নিং কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, আমরা প্রতিটি দপ্তরে এ নিয়ে একাধিক সভা করেছি। আমার জেলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মহোদয় পৃথক সভায় গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সভায় অংশ গ্রহণ করেছেন। আমারা নিয়মিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে অবহিতকরণ সভা করেছি।
গ্রামের মানুষ এখনও গণভোট নিয়ে কিছু জানেন না প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ভোটের আরও যে সময় বাকী আছে, সেই সময়ে সকল মানুষকে আমরা গণভোট জানতে পারবে। কারণ আমরা চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশ সদস্য দিয়ে গ্রামে গিয়ে লিফলেট প্রচার করে যাচ্ছি।
