কোষাগার ভরলেও না খেলার অতৃপ্তি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

বিশ্বকাপ বর্জন করলেও আইসিসি কোনো শাস্তি দেবে না বাংলাদেশকে, ভাগের টাকাও মিলবে। রবিবার মধ্যরাতে আইসিসির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ভাষায় এবার আগের সেই কাঠিন্য নেই, বরং ২০ কোটি ক্রিকেট দর্শকের বাজারের প্রতি তাদের সম্ভ্রমটা স্পষ্ট। একই সঙ্গে স্পষ্ট পাকিস্তানের আগের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিতও, ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ হচ্ছে। আমে আর দুধে মিশে যাওয়ার পর আঁটি আলাদা পরে থাকার মতোই বিশ্বকাপে খেলা হলো না কেবল বাংলাদেশের। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভারতে না যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নীরব দর্শকই হয়ে রইল। আইসিসির সিদ্ধান্তে বিসিবির কোষাগার ভরবে, তবে বিশ্বকাপ না খেলায় পরের বিশ্বকাপের জন্য খেলার যোগ্যতা অর্জনের রাস্তাটা যে কঠিন হয়ে গেল, তার কী হবে?

সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার জন্য অনুরোধ করেছেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বিসিবি জানায়, সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘এই সময়ে বাংলাদেশকে সহায়তায় পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা গভীরভাবে অভিভূত। আমাদের এই ভ্রাতৃত্ব দীর্ঘজীবী হোক। গতকাল আমার সংক্ষিপ্ত পাকিস্তান সফর এবং আমাদের আলোচনার সম্ভাব্য ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে, আমি পাকিস্তানকে অনুরোধ করছি যেন তারা পুরো ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের স্বার্থে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচটি খেলে।’ কিছু সময় পর আইসিসিও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘আইসিসি এবং পিসিবির মধ্যে এই সংলাপটি একটি বৃহত্তর সম্পৃক্ততার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই গঠনমূলক লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তারা সততা, নিরপেক্ষতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে ক্রিকেটের সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষার আকাক্সক্ষায় ঐক্যবদ্ধ, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে।

সেই বিদ্যমান সংহতির চেতনায় এটি সম্মত হয়েছে যে, সব সদস্য আইসিসি ইভেন্টগুলোতে অংশগ্রহণের শর্তাবলি অনুযায়ী তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এবং আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চলমান আসরটি সফল করতে যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই করবে।

বাংলাদেশের বিষয়ে আইসিসি ক্রিকেটের অন্যতম প্রাণবন্ত এই বাজারেÑ যেখানে ২০ কোটিও বেশি উৎসাহী ভক্ত রয়েছেÑ ক্রিকেটের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে তাদের সহায়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। আইসিসি নিশ্চিত করতে চায় যে, আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ বাংলাদেশ জাতীয় দলের অংশগ্রহণ না করা যেন দেশটির ক্রিকেটে কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব না ফেলে। আইসিসি আরও জানিয়েছে বাংলাদেশকে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অংশগ্রহণ না করার জন্য কোনো রকম আর্থিক শাস্তির মুখে কিংবা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হবে না। বাংলাদেশ চাইলে বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে যেতে পারে, যেটা বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার। আইসিসি এই ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি আইসিসি ইভেন্টের আয়োজক হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আয়োজন দক্ষতার ওপর আইসিসির আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে এবং আইসিসি এভাবেই অর্থবহ আয়োজক স্বত্ব প্রদানের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট উন্নয়নে সুযোগ করে দিচ্ছে। আইসিসির প্রধান নির্বাহী সানযোগ গুপ্তার সুরও নরম। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বক্তা ছিলেন আইসিসিরি একজন মুখপাত্র, এবারে প্রধান নির্বাহীর কণ্ঠে বাংলাদেশ বন্দনা, ‘আইসিসি  টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি অনুতাপের বিষয়, তবে এটি একটি অন্যতম প্রধান ক্রিকেটীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আইসিসির দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতিকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করে না। আমাদের মনোযোগ বিসিবি-সহ অন্য প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার দিকেই রয়েছে, যাতে দেশটির ক্রিকেট টেকসইভাবে বৃদ্ধি পায় এবং খেলোয়াড় ও ভক্তদের জন্য ভবিষ্যতের সুযোগগুলো আরও শক্তিশালী হয়। বাংলাদেশ একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্রিকেট বাস্তুতন্ত্রের হিসেবেই থাকবে যা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং বৈশ্বিক ক্রিকেটের সঙ্গে একীভূত হওয়ার দাবি রাখে। সাময়িক কোনো বিঘœ বা ছন্দপতন দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গুরুত্ব বিচার করা হয় না।’

দেশে ফিরে একটি গণমাধ্যমকে বুলবুল জানিয়েছেন, কেন পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলার অনুরোধ জানিয়েছেন, ‘ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ এটা শুধুমাত্র একটা ম্যাচ না, এটা আইসিসির আর্থিক দিক থেকে শুধু না, বাণিজ্যিক দিক থেকে শুরু করে একটা ঐতিহ্য। যেহেতু আমরা খেলতে পারিনি, ক্রিকেটের স্বার্থে আমরা পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছি যেন পাকিস্তান ম্যাচটা খেলে এবং তারা সেটা বিবেচনা করছে। এখন আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে বাংলাদেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বার্থ সব থেকে আগে, দেশের পক্ষে আমরা থাকব। ক্রিকেট খেলার থেকে দেশ অনেক বড়।’ বুলবুল আরও জানিয়েছেন, সামনে নারী অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজন করবে বাংলাদেশ, সেই সঙ্গে ম্যাচসংখ্যা বাড়বে ২০৩১ ওয়ানডে বিশ্বকাপে, ‘যেহেতু আমরা বিশ্বকাপ খেলতে পারলাম না, সে জন্য যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে সেটা পূরণ করতে আমরা কিছু ইভেন্ট করতে পারি। যেমন আগামী বছর মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৯ ওয়ার্ল্ড কাপ (আয়োজন) করছি। (২০) ৩১ সালে ভারতের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ করছি, সেখানে আমরা আরও কিছু বেশি ম্যাচ কীভাবে পাই সেই দাবি রাখা হয়েছে।’

মাত্র দেড় ঘণ্টার নোটিসে লাহোর গিয়ে পেয়েছেন রাজকীয় অভ্যর্থনা, অংশ নিয়েছেন ঘুড়ি উৎসবে। করেছেন ম্যারাথন বৈঠক। এই সফর থেকে ক্রিকেট প্রশাসক বুলবুলের প্রাপ্তির পাল্লাই ভারী। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্কের যে প্রভাব ক্রিকেটে পড়েছে, সেই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাসের দোলাচল থেকে সাময়িক একটা পরিত্রাণ মিলেছে। এখন সবই হবে, শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাই খেলবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত