অর্থনৈতিক মুক্তিই প্রকৃত স্বাধীনতা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৪ এএম

বাংলাদেশের গণতন্ত্র বারবার আহত হয়েছে; আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটিয়ে ফিরে এসেছে, বারবার উদ্ধার হয়েছে গণতন্ত্র, কিন্তু অর্থনীতি? অর্থনীতি সেই ১৯৭১ সাল থেকেই মুক্তির অপেক্ষায়। তাই  বারবার গণতন্ত্র পরাধীন হয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি যত দিন না মিলবে, তত দিন গণতন্ত্রও বারবার পরাধীন হবে। প্রকৃত অর্থে, অর্থনৈতিক মুক্তিই প্রকৃত স্বাধীনতা। ধরুন, একজন ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন; কিন্তু তার হাতে কোনো প্রকার অর্থকড়ি নেই। অর্থ ছাড়া সেই ব্যক্তি দুই পা-ও চলতে পারবে না। যদি চলেও, তাহলে তাকে কারও না কারও সহযোগিতা নিতে হবে। তাহলে কি তাকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বলা যায়? তাই স্বচ্ছ নির্বাচনের পর এবার প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের, যেখানে মিলবে অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথমে আলোচনা করা যাক, গণতন্ত্র কীভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে বা পরাধীন হয়েছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে ‘বাকশাল’ কায়েম করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়। এরপর বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু সেই গণতন্ত্রই আবার অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে পুনরায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে উত্তরণ হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতি সেই একই অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতির মুক্তি আজও মেলেনি। কবে মিলবে, তাও সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক মুক্তি না মিললে, কখনোই গণতন্ত্র স্থায়ী হবে না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী চাটুকারদের খপ্পরে পড়ে বারবার পথভ্রষ্ট হয়েছে; বিপরীতে গণতন্ত্র বিনষ্ট হয়েছে, অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে সব ধরনের শস্য ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব এবং দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করাও অসম্ভব নয়। শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে এবং সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে খাদ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে, সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। এতে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঘাটতিতে পড়বে। শুধু তাই নয়, এই পণ্যগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধাও দিতে হবে, ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং চারদিক থেকেই বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো,  বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষিপণ্য আমদানি হচ্ছে। সুতরাং এই খাতটিতে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হবে। যাতে দেশ অন্তত কৃষিতে মুক্তি মিলে। প্রকৃত মুক্তি মিলবে অর্থনীতির মুক্তি মিললে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাত, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সামগ্রিক পিএমআই সূচক নির্ধারণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, গত বছরে জানুয়ারিতে সামগ্রিক পিএমআই সূচক ছিল ৬৫ দশমিক ৭ অথচ এ বছর একই সময় ৫৩ দশমিক ৯। অর্থাৎ বৃদ্ধি না পেয়ে আরও কমেছে। সুতরাং পরিতাপের বিষয় হলো, অর্থনীতির মুক্তি থেকে আরও যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এসব বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। কারণ, মোট দেশজ উৎপাদন, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এবং রপ্তানি ও আমদানি যা কিছুই বলি না কেন, এর পেছনে যে নিয়ামক ব্যবহার করে তাহলো ব্যাংক।

অর্থনীতির সবচেয়ে ভগ্নদশা হলো ব্যাংকিং খাতে। এই খাত ঘুরে না দাঁড়ালে বাংলাদেশের অর্থনীতির কখনোই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। পাহাড়ি জনপদের টংয়ের চায়ের দোকান সাধারণত কয়েকটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে যত খুঁটিই থাকুক না কেন, মাঝখানের খুঁটিটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী। বাইরের খুঁটিগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল হলেও সমস্যা হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত মাঝের খুঁটিটি দৃঢ় থাকে। কিন্তু যদি সেই কেন্দ্রীয় খুঁটিটি দুর্বল হয়ে যায় বা নষ্ট হয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো টংয়ের দোকানটি যেকোনো ঝড় বা চাপেই ভেঙে পড়ে। এই টংয়ের দোকানটি যদি নিয়মিত সংস্কার না করা হয়, কাঠ পচে যায়, খুঁটি দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে বিপর্যয় অনিবার্য। বিশেষ করে মাঝের খুঁটিটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো কাঠামোই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ঠিক একইভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একটি শক্ত কেন্দ্রীয় খুঁটি রয়েছে তা হলো ব্যাংকিং খাত। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির অন্য উপাদানগুলো যেন সেই টংয়ের বাইরের খুঁটি আর ব্যাংকিং খাত হলো মাঝখানের প্রধান খুঁটি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এই কেন্দ্রীয় খুঁটিটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্তর থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকিং খাত ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত নিজেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কারণ সাধারণ গ্রাহক যারা আছেন তারা তাদের আমানতের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এ রকম সব ব্যাংকের গ্রাহক যে তা নয়, তবে অধিকাংশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে।

এই খাতে আস্থা ফেরাতে হলে অবশ্যই খেলাপি ঋণ আদায়ে অধিকতর কঠোর হতে হবে অথবা টাকা ছাপিয়ে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হবে। তবে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকিং খাতে সহযোগিতা করলে সেটি হবে আত্মঘাতী। কারণ টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থির হলেও, তা এখনো জনসাধারণের নাগালের বাইরে রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আনা বা নাগালের মধ্যে আনা এ সরকারের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে। বাংলাদেশে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের যে অপসংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা পরিহার করে ঋণ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যাংকিং খাত স্থির হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, বাংলাদেশের জিডিপির উন্নয়ন হবে, তবেই মিলবে অর্থনীতির মুক্তি। তাই ব্যাংকিং খাতকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সুশাসন।  তখনই আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি এবং গণতন্ত্র স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত