দরকার ভাষার সঞ্জীবনীকরণ

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

বর্তমান পৃথিবীতে ভাষা শুধু ভাষা নয়, ক্ষমতা সৃষ্টিকারী উপায়ও। পৃথিবীটা অনেক ভাষার  হলেও বর্তমানে  ক্ষমতার ভাষা হিসেবে অল্প কয়েকটি ভাষারই রাজত্ব চলছে। কিন্তু এটাও সমান বাস্তবতা যে, পৃথিবীতে একভাষী দেশ বলতে কিছু নেই, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও দশ শতাংশ মানুষ ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার করে। অন্য অনেক দেশেই এক অবস্থা। বহুভাষিতা যেন আধুনিক রাষ্ট্রের নিয়তি। এর পেছনে রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, প্রাকৃতিক বা মানবিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণ রয়েছে। এটা ভাষা-জনতত্ত্বের একটি কার্যকর বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন আসে, এই বহুভাষাবাদকে সুরক্ষার জন্য কী করা যায়? এর সোজা জবাব ভাষার প্রযত্নায়নকে নিশ্চিত করা। কিন্তু ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের এই মোক্ষম যুগে বিষয়টা অত্যন্ত কঠিন।

১৯৯৯ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে ৬৭৮৪টি ভাষাকে চিহ্নিত করা গেছে যার মধ্যে ৬০৬০টির তথ্যাবলি প্রতুল। এর কারণ, অনেক গোত্রের মধ্যে ব্যবহৃত ভাষাটির কোনো নাম নাই, এক্ষেত্রে নিজেদের ভাষাকে চিহ্নিত করতে তারা শুধু বলে থাকে ‘আমাদের ভাষা’; আবার অনেক সম্প্রদায় তাদের ভাষাকে অনেক নামে ডেকে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ভাষাকে অনেক নামেও ডাকা হয়। রেজিস্টারকৃত ভাষাগুলোর মধ্যে ৫১টি ভাষায় শুধু একজন কথা বলার লোক রয়েছে। ৫০০টি ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা ১০০ জনেরও কম। ১৫০০টি ভাষায় কথা বলে ১০০০ জনেরও কম। ৫০০০টি ভাষায় এক লাখেরও কম। এই উপাত্ত এ-ই বলে যে, অনেক ভাষার মৃত্যু বা বিলুপ্তি হতে চলেছে এবং ইতিমধ্যে হয়েছেও। ভাষার মৃত্যু হয় যখন ওই ভাষায় কথা বলার দ্বিতীয় মানুষটি আর থাকে না। একজন থাকলে ওই ভাষায় কথা বলার সুযোগ থাকে না। ফলত একসময় শেষ ভাষীটির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভাষাটিরও মৃত্যু হয়ে যায়। ভাষাটির ওপর গবেষণা চলতে পারে কিন্তু ওই ভাষায় কথাবার্তা না-চললে তাকে মৃত ভাষা বলা হবে।

কিন্তু কেন তা ঘটে? ভাষার মৃত্যু হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গণহত্যা বা সাংস্কৃতিক সাঙ্গীকরণের কারণে। বিচ্ছিন্ন ভূগোলের ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলো নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবিক দুর্যোগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ প্রধান একটি কারণ যা শুরু হয়েছিল ৫০০ বছর আগে, উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে। আর এক্ষেত্রে প্রধান কয়েকটি ভাষা নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে: ইংরেজি, চীনা, ফরাসি, পর্তুগিজ, ডাচ, স্প্যানিশ, রুশ, আরবি ইত্যাদি। আবার উপনিবেশ স্থাপনের আগে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যে-সম্রাটরা রাজ্য দখল করত, তাদের ভাষাও আরোপিত হতো বিজিত রাজ্যের অধিবাসীদের ওপর। এ বিষয়ে ডারউইন বিবর্তনকে মাথায় রেখেই বলেছেন, প্রধান ভাষা এবং উপভাষাগুলো ছড়িয়ে পড়ার কারণেই অন্য ভাষাগুলো ক্রমাগত বিলুপ্তির পথে চলে যেতে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই আত্মীকরণ এখন অন্য পরিসরে আরও জোরদার হয়েছে, তা হচ্ছে ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের অমোঘ বিস্তারে।

কিন্তু ভাষা লুপ্ত হলে কী যায় আসে? পৃথিবীতে কত কিছুই তো হারিয়ে যায়, রূপান্তরিত হয় বিপ্লবী বা বিবর্তনিক প্রক্রিয়ায়। তবে কিছু ভাষা গেলে ক্ষতি কী?  প্রাণিজগতের, উদ্ভিদজগতের অনেক কিছু লুপ্ত হয়ে যাওয়াতে যে কষ্টবোধ, যে হাহাকারবোধ আমাদের তাড়া করে ফেরে, ভাষা-বিলুপ্তি তার চেয়েও কষ্টের। এটা আমাদের বৈশ্বিক বৈচিত্র্যকে নষ্ট করে ফেলে। যে বিচিত্রের সন্ধান সতত আমরা করে বেড়াই, সেই সন্ধানী বিষয়গুলো না-থাকলে আমাদের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগমন অসম্ভব। এই বিলুপ্তির হাত থেকে ভাষাকে রক্ষা করা যায় ভাষার পুনঃসঞ্জীবনীকরণের মাধ্যমে। এ কাজে আক্রান্ত ভাষাটির জন্য প্রথমেই প্রয়োজন তার প্রতি মূল সংস্কৃৃতির সমর্থন। তারপর এর পেছনে অর্থ বরাদ্দ করা যেন ডকুমেন্টিংয়ের জন্য কাজ করা যায়। 

ভাষা মানুষের অস্তিত্ব ও অহমের অংশ। ভাষারক্ষা তো অস্তিত্বকেই রক্ষা, নিজের মাতৃরূপকে রক্ষা করা। মাতৃরূপ হলো অস্তিত্বের এক অধিষ্ঠান যা জীবনের ও জগতের অবিছিন্নতাকে ভেতর থেকে রক্ষা করে চলে। ভাষা হারিয়ে গেলে বা দুর্বল হতে থাকলে সেই অপচিতির বেদনা থাকে অপরিমাপিত।

বাংলার ভাষা-জনতত্ত্ব বিশাল হলেও তা জটিল এবং অকার্যকর। বিরাট জনগোষ্ঠী অভিবাসী হিসেবে বাইরের দেশে বসবাস করলেও বসবাসকারী দেশে নিজ ভাষার উন্নয়নে তা কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।  জনসংখ্যায় পৃথিবীর অন্যতম একটি প্রধান ভাষা হলেও বাংলা ভাষা শক্তিশালী ভাষা হিসেবে বৈশ্বিক দরবারে আবির্ভূত হতে পারেনি। শিক্ষা, প্রশাসন, সাহিত্য ও প্রযুক্তিতে ভাষাটির দেশীয় উপস্থিতি, এবং আন্তর্জাতিকভাবে ভাষাটির উপস্থিতি বিবেচনা করলে বাংলা ভাষার অবস্থান নাজুকই বলা যায়। চারপাশের রাষ্ট্রগুলো দেখলে আমরা বুঝব, কিছু দেশ কীভাবে তাদের ভাষাকে বিশিষ্ট করে ব্যবহার করে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সফ্ট পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভাষা-সংস্কৃতির এই সক্ষমতা হলো আকর্ষণের রাজনীতি বা প্রভাবের নান্দনিকতা যা অন্য ভাষাভাষীর মন জয় করার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা ও প্রসারিত করে। একটি অত্যন্ত প্রাচীন ভাষার উত্তরাধিকারী এবং শক্তিশালী সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাষা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সফ্ট পাওয়ার হিসেবে এখনো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আমাদের উচিত সফ্ট পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশের ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করা যা বহির্বিশ্বে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির চাহিদা সৃষ্টি করবে।  এটা সম্ভব সাংস্কৃতিক কূটনীতি, সাংস্কৃতিক বিনিময়, বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক এজেন্সি, জনকূটনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে যে, ভাষাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করার উপায় হলো ভাষাব্যবহারকারী জনসংখ্যার মধ্যে ভাষাক্রিয়ার বৃদ্ধি ঘটানো, ভাষাকে মৌলিক জ্ঞান উৎপাদনের আধার করে তোলা, বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, উন্নত সাহিত্য রচনা ও অনুবাদ করা, প্রযুক্তির ভাষায় উন্নীত করা। এজন্য দরকার শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণ, একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলার প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, পর্যটনের উন্নয়ন, বিশ্বমানের অনুবাদ প্রকল্প গ্রহণ, ডিজিটাল উপাদান (কনটেন্ট) বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলা তথ্যের সমৃদ্ধিকরণ, এবং সর্বোপরি জাতীয় মূল্যবোধ এবং পরিচয়ের গুণগত পরিবর্তন সাধন করা, ইত্যাদি ব্যবস্থার উদ্যোগ-গ্রহণ। একইসঙ্গে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা ও কৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পুনঃসঞ্জীবনীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা, তাদের সংগীত ও সংস্কৃতির ‘সিগনেচার’ সৃষ্টি করা। এসব বিচ্ছিন্নভাবে না করে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করে অগ্রসর হতে হবে, না হলে প্রত্যাশিত ফলাফল অপ্রাপ্তই রয়ে যাবে। আর এসব না হলে একুশে ফেব্রুয়ারির উদ্যাপনে আমাদের ভাষামাহাত্ম্য বা ভাষা-অহংকার হাস্যকর হয়েই থাকবে।

 লেখক : কবি, কথাকার, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত