কৃষিপণ্য উৎপাদনের মৌসুম (পিক সিজন) চলছে এখন, যা বোরো মৌসুম হিসেবেও পরিচিত। এ সময় আলু, পেঁয়াজ, চালের মতো পণ্যের জোগানে পুরো বছর চলে। কোনো কারণে এসব পণ্যের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব থাকে বছর জুড়ে। এ মৌসুমেই কি না বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে দেশের কৃষকদের, যা শুধু উৎপাদন খরচই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, খাদ্য নিরাপত্তাকেও শঙ্কায় ফেলে দিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, নজরদারির অভাবে বেপরোয়া ডিলার-খুচরা বিক্রেতা চক্র সারা দেশে সারের দামে অরাজকতা তৈরি করেছে। সরবরাহ ঘাটতিরও অভিযোগ রয়েছে।
রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ অন্তত ১০ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ২ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কৃষক নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছে না। সরকার কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সারের দাম ২৭ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। টিএসপির নির্ধারিত দাম ২৭ টাকা হলেও কেজিতে ৩ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। ২১ টাকা মূল্যের ডিএপির জন্য ৭ থেকে ১৫ টাকা এবং ২০ টাকা মূল্যের এমওপি সারে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৮ টাকা। সরকার এ সারগুলোতে ভর্তুকি দেয় এবং এসবের জোগান ঠিক রাখতে সরাসরি আমদানি করে ও তদারকি করে। কারণ এসব সারে সংকট তৈরি হলে তা খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে।
কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষিকে বাঁচাতে হলে কৃষকের স্বার্থ আগে রক্ষা করতে হবে। ভালো ফলনের জন্য সার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষি খাতে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেশ রূপান্তরের বগুড়া প্রতিনিধি সাখাওয়াত হোসেন জনি জেলাটির কয়েকটি উপজেলার কৃষক, ডিলার, খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষি অফিসারদের সঙ্গে কথা বলেন। কাহালু ও শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা জানিয়েছেন, খুচরা পর্যায়ে তারা ইউরিয়া সার কিনছেন ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। টিএসপি ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে। এমওপি সার কিনছেন ২৬ থেকে ২৮ টাকা কেজি দরে এবং ডিএপি সার কিনছেন ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।
দামের একটু হেরফের হলেও বেশি দামেই সার বিক্রি হচ্ছে দিনাজপুর ও জামালপুরে। জামালপুরের প্রতিনিধি ময়না আকন্দ ও দিনাজপুরের প্রতিনিধি কুরবান আলী জানিয়েছেন, কোনো সারই সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে না।
দিনাজপুর সদর উপজেলার গৌরীপুরের কৃষক আকমল হোসেন বলেন, ‘আমরা সবসময় সার ও বীজ নিয়ে ঝামেলায় পড়ি। সময়মতো এসব পাওয়া যায় না। ডিলারদের কাছে গেলে সার পাই না। আবার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেলে সার পাওয়া যায়, কিন্তু বাড়তি দাম দিতে হয়।’
একই কথা জানান জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মমিন শেখ। তিনি বলেন, ‘বেশি দামের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, ধান বেচে সেই খরচ যাতে তুলতে পারা যায় সে নিশ্চয়তা চাই। না হলে নির্ধারিত দামে সারের ব্যবস্থা করা হোক।’
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, ‘সারের সংকট নেই। বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাইনি। পেলে ব্যবস্থা নেব।’ অথচ জেলা জুড়ে বাড়তি দামেই সার বিক্রি হচ্ছে।
রংপুর প্রতিনিধি তাজিদুল ইসলাম লাল জানান, জেলা জুড়ে খুচরা বিক্রেতারা যে সার বিক্রি করছেন, তার রসিদ কৃষককে দেন না। এমনটা করার কারণ বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ জোগাড় করে ক্রেতারা যাতে অভিযোগ করতে না পারেন। সংশ্লিষ্ট ডিলাররা খুচরা বিক্রেতাদের এমন নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গান্নারপাড়ের কৃষক আতাউর রহমান জানান, আলুর মৌসুম থেকেই টিএসপি ও ডিএপি সার ডিলারদের কাছে পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হয়েছে। কিন্তু দাম ছিল সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। দাম কমেনি বোরো মৌসুমেও। একই কথা জানান ওই এলাকার কৃষক রবিউল ইসলাম, লাবু মিয়া, মাহতাব মিয়া, রমজান আলী এবং আরও অনেকে। তারা জানান, এ মৌসুমে টিএসপি ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, ডিএপি ২৯ থেকে ৩০ টাকা, এমওপি ২২ থেকে ২৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
রংপুর সদরের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলার মেসার্স শফিয়ার রহমানের মালিক মো. শফিয়ার রহমান জানান, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে একজন ডিলার টিএসপি ১৫ বস্তা ও ডিএপি ৯৪ বস্তা করে পেয়েছেন, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তবে অন্যান্য সারের বরাদ্দ স্বাভাবিক রয়েছে। ডিএপি সারের সংকট রয়েছে।
অবশ্য রংপুর মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, সারের সংকট নেই। বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরবরাহ ঘাটতির চিত্রও আছে : কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু কিছু সারের ক্ষেত্রে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বরাদ্দ কমেছে। পরিমাণে কম হলেও সেটা সরবরাহ ঘাটতিকেই ইঙ্গিত করে। যদিও উপজেলা কৃষি অফিসারদের মতোই কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রতিটি জেলায় চাহিদা অনুযায়ীই সারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে টিএসপি সারের মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭৫ হাজার ৫০০ টন, গত বছর ছিল ৮০ হাজার ৮০০ টনের বেশি। ডিএপি সারের বরাদ্দ ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টন। গত বছর ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার টনের বেশি। এ দুটি সারে খানিকটা সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গত বছর এমওপি সারের যে বরাদ্দ ছিল এবার তার চেয়ে প্রায় দুই হাজার টন বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৭ হাজার ৮০০ টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত সরকারের হিসাবে সাড়ে ৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি সারের মজুদ ছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারের মজুদ বেশি থাকলেও খুব একটা লাভ নেই। কারণ কৃষক বেশি দাম দিয়েই সার কিনছেন। শুধু বোরো ধান চাষেই নয়, আলু, সরিষা, পেঁয়াজ, সবজির মতো পণ্যগুলোর উৎপাদনে ব্যবহৃত সার বেশি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে কৃষককে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, উৎপাদন মৌসুমের শুরুটা হয় নানা ধরনের সবজি, সরিষা, আলু, পেঁয়াজের চাষাবাদের মধ্য দিয়ে, যার শেষ হয় বোরো ধান ঘরে তুলে। বোরো মৌসুমে সোয়া দুই কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়, যা সারা দেশের চাল সরবরাহের একটি শক্ত ভিত তৈরি করে। এ মৌসুমে চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা বছর দামে ভোগান্তি থাকে। সারা দেশে বোরো মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়, যা বীজ, সার ও সেচনির্ভর।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ২০২৪-এর ৮ আগস্ট। দায়িত্ব নেওয়ার দুই-আড়াই মাস পরই শুরু হয়েছিল পিক সিজন। সে সময় চাল, আলু ও পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছিল। কিন্তু সেবার কৃষককে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হয়েছিল। সরকার সারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
শুধু বোরোই নয়, আমন মৌসুমেও দেড় কোটি টনের বেশি চালের সরবরাহ হয়েছে। গত আমন মৌসুমেও ভালো ফলন হয় এবং রেকর্ড ১ কোটি ৮০ লাখ টন ফলনের প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। কিন্তু সেই মৌসুমেও কৃষককে অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনতে হয়েছে। কিছু অভিযানে ডিলারদের জরিমানাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দাম কমানো যায়নি।
এবারও একই অবস্থা। তবে এবার নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে নীরবে কৃষকের পকেট কাটছে সার চক্রটি। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেখেও না দেখার ভান করছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলাতেই এখন রয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। সবাই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এখনো বাড়তি দামে সার বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষক চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এটা ধীরে ধীরে হয়। এখন যেমন সব বাদ দিয়ে ভুট্টা চাষে কৃষক বেশি মনোযোগী হয়েছেন। কারণ ভালো দাম পাওয়া যায়। কিন্তু ধানের দামে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উপকরণ কিনতে অতিরিক্ত খরচ হতে থাকলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত তৈরি করবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি।’