টাঙ্গাইলের কালিহাতী পৌর এলাকার ঘুনী গ্রামে এক অসহায় পরিবারের জীবন সংগ্রামের চিত্র যেন নীরবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি। কালিহাতী মুন্সিপাড়া থেকে ঘুনী রোডে এগোলেই ঘুনী পূর্বপাড়ায় পাকা রাস্তার পাশেই চোখে পড়ে একটি ভাঙাচোরা টিনের ঘর। চালার টিনে জং ধরেছে, কোথাও কোথাও ফুটো। বারান্দার সামনে ছেঁড়া কাপড় ঝুলিয়ে বানানো অস্থায়ী পর্দা, পাশে বাঁশ ও টিনের জোড়াতালি। এই ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘরটিই কাজুলী বেগমের পৃথিবী।
দিনের আলোয় ঘরটি যেমন নড়বড়ে মনে হয়, রাতের অন্ধকারে তা আরও ভীতিকর হয়ে ওঠে। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে নামে গভীর অন্ধকার। তখন একটি মোমবাতিই হয়ে ওঠে একমাত্র আলোর উৎস। বাতাসে দুলতে থাকা সেই আলোতেই কাটে তাদের দীর্ঘ রাত।
কাজুলী বেগমের নেই কোনও সন্তান। স্বামী কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় নিয়মিত কাজ করার সামর্থ্য নেই। কখনো গ্রাম ঘুরে মানুষের কাছে ৫ বা ১০ টাকা চেয়ে আনেন, কখনও বা কেউ দয়া করে ভাত দেন। এভাবেই কোনও রকমে চলছে সংসার। প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ঘর মেরামত বা নতুন করে কিছু গড়ার স্বপ্ন তাদের কাছে বিলাসিতা মাত্র।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ঘরে নেই কোনও টয়লেট। প্রয়োজন মেটাতে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। পানীয় জল সংগ্রহ করতে হয় প্রতিবেশীর টিউবওয়েল থেকে। অনেক সময় সংকোচ আর অপমানবোধ নিয়েই এসব করতে হয়। তবুও উপায় নেই।
বর্ষা মৌসুমে তাদের দুর্ভোগ বাড়ে কয়েকগুণ। টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে, কাদামাটিতে ভিজে যায় ভিটা। ঝড়-হাওয়ায় মনে হয়, এই বুঝি পুরো ঘর ভেঙে পড়ে। রাত জেগে আতঙ্কে কাটে সময়। শীতকালে টিনের ঘর হয়ে ওঠে বরফশীতল, আর গ্রীষ্মে আগুনের মতো উত্তপ্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, কাজুলী বেগম বহুদিন ধরেই সরকারি সহায়তার আশায় আছেন। একটু সহায়তা পেলে অন্তত একটি নিরাপদ ঘর পেতেন। একটি টয়লেট, একটি টিউবওয়েল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ তাদের জীবনে আনতে পারে স্বস্তি।
এ বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওই পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তার আওতায় যা যা দরকার, সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিলে পরিবারটি মানবেতর জীবন থেকে মুক্তি পেতে পারে। সামান্য উদ্যোগেই এই পরিবারটির জীবনমান বদলানো সম্ভব। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় পিছিয়ে পড়া এমন মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে মানবিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয়।
ঘুনী গ্রামের নিভৃত কোণে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১ শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাঙা ঘরটি যেন প্রতিদিনই প্রশ্ন তোলে উন্নয়নের ছোঁয়া কি পৌঁছেছে সবার দুয়ারে?
কাজুলী বেগম বলেন, আমাগো এই ঘরডা দেখেন, যেকোনও সময় ভাইঙ্গা পড়ব মনে হয়। বৃষ্টি আইলে ভেতরে পানি পড়ে, সারা রাত জাইগা থাকি। বিদ্যুৎ নাই, মোমবাতি জ্বালাইয়া থাকি। বাতাস আইলে সেইটাও নিভা যায়। আমাগো নিজের টয়লেট নাই, অন্যের বাড়ি যাইতে হয়। পানি খাওনের লাইগা আরেক বাড়ির টিউবওয়েল থেইকা পানি আনি। অনেক লজ্জা লাগে, তয় কি করমু? উপায় তো নাই।
তিনি বলেন, আমার কোনও পোলা-মাইয়া নাই। আমার স্বামীও ভালো না, মাথার সমস্যা আছে, কাম-কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। মানুষজনের দুয়ারে দুয়ারে গিয়া ৫-১০ টাকা চাইয়া যা পাই, ওই দিয়া কোনোরকমে চলতাছি। সরকারের কাছে আমার আর বেশি কিছু চাওন নাই। একটা ভালো ঘর, একটা টয়লেট, একটা টিউবওয়েল আর বিদ্যুৎটা দিয়া দিলে বাকি জীবনডা একটু শান্তিতে থাকতে পারমু।