ফেনীতে ইটভাটার দৌরাত্মে হুমকিতে পরিবেশ

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

পরিবেশ আইন অমান্য করে ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০৩টি ইটভাটায় রাতের আঁধারে কৃষি জমির উর্বর মাটি কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে যেমন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকেই চলাচল শুরু করে মাটিভর্তি শতাধিক ট্রাক ও পিকাপ চলে রাতভর। মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের প্রভাব পড়ছে সড়কগুলোতেও। রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অভিযানে জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি এস্কেভেটর ও ট্রাক্টর জব্দ করেও থামানো যাচ্ছে না মাটি খেকোদের। মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে।

জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া, শর্শদী, বালিগাঁও, ছনুয়া, মোটবী, কাজিরবাগ, দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর, জায়লস্কর, সিন্দুরপুর, রামনগর, এয়াকুবপুর, মাতুভূঞাসহ ফুলগাজী, পরশুরাম ও সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমি থেকে রাতের আঁধারে কাটা হচ্ছে উর্বর ফসলী জমির মাটি।  গত দশ বছর ধরে  এ ধরণের কর্মকাণ্ড চলছে।

উত্তর কাশিমপুর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, ওই এলাকায় ফসলি জমি থেকে প্রতিদিনই মাটি লুট করা হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ীরা ভেকু (এস্কেভেটর ) দিয়ে কোথাও ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। এসব গর্তে পাশের কৃষিজমির মাটিও ভেঙে পড়ছে। এখানকার অধিকাংশ কৃষক বাধ্য হয়ে মাটি বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।

বাদ যাচ্ছে না খাসজমি, খাল ও নদ-নদীর তীর। এসব মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়ায় এরই মধ্যে শতাধিক একর কৃষি জমি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে আগে বোরো ধান আর সরষে চাষ করা হতো। মাটি কেটে নেয়ায় ওই সব জমির দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন। পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, ওই এলাকায় কয়েক বিঘা জমির ওপর ধান চাষ ও বিভিন্ন সবজি লাগিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। রাতের আঁধারে আজাদ ও জিয়া নামের এক মাটি ব্যবসায়ী কৃষিজমি থেকে এস্কেভেটর দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নিয়ে যায়। এতে পাশের কৃষিজমির মাটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাটিকাটা বন্ধ না করলে একসময় ওই এলাকা থেকে কৃষিজমি হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কৃষি জমি থেকে মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এক মাটি ব্যবসায়ী বলেন, যাঁরা মাটি বিক্রি করছেন, তাঁরা জেনে শুনেই বিক্রি করছেন। আর আমরা কিনে নিয়ে আশপাশের ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করছি। এই এলাকার মাটি ইটভাটার জন্য খুবই উপযোগী।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বিগত এক মাসে জেলার বিভিন্ন স্থানে রাতের বেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ফসলি জমির উর্বর মাটি কাটার বিরুদ্ধে অন্তত ২৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড ও ৭জনকে কারাদন্ডের পাশাপাশি মাটি কাটার বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করা হয়। কিন্তু এসব অভিযানেও রক্ষা করা যাচ্ছে না ফসলি জমির উর্বর মাটি। 

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়ার ডমুরুয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, কাটাখালি ব্রিজের পাশে নদীর পারের এলাকা থেকে বিএনপি নেতা মোজাম্মেল হকসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। ধ্বংস করা হচ্ছে কৃষিজমি। এ ছাড়া পরিবেশের ক্ষতি করে মাটি কেটে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।

ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ভগবানপুর-লক্ষ্মীয়ারা দেড় কিলোমিটার সড়কটি প্রায় ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পাকা করা হয়েছে। রাতের আঁধারে মাটির গাড়ি চলাচল করায় রাস্তাটি কাজ শেষ হওয়ার মাস খানেকের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফেনী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু তৈয়ব বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চির মধ্যে মাটির জৈব উপাদান থাকে। সেই মাটি কাটা হলে জমির জৈব উপাদান চলে যায়। এতে জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়। ফসলি জমির মাটি কাটা তাই বেআইনি।

মাটিকাটা প্রসঙ্গে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন ভিপি বলেন, কেয়ামত পর্যন্ত মাটি কাটা চলবে, ঘরবাড়ি নির্মাণে ইট দরকার। ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু বলেন, আমার আসনে মাটি কাটা বন্ধ হবে, আমি কথা দিচ্ছি। জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ফসলী জমির মাটি কাটা নিষিদ্ধ, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-তে মাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাসকরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, অন্য আইনে যাই-থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হতে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না। 

জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, ফসলি জমির উর্বর মাটি রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাটির বিক্রেতা-ক্রেতা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জমির মালিকানা বাজেয়াপ্ত করারও আলোচনা হয়েছে। 

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফসলি জমির টপসয়েল বিক্রি করা আইনগতভাবে অপরাধ। এসব মাটি বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চলমান। ফসলি জমির মাটির ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই সমান অপরাধী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত