প্রত্যাশার অনির্বাণ শিখা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০৮ এএম

সব প্রত্যাশার দীপশিখা, অনির্বাণ থাকে না। এর বড় কারণ, নিজেরাই সেটা নিভিয়ে দিই বা নেভানোর জন্য যা য করা দরকার, করি। এটা ইতিহাসের অংশ। সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অনেক প্রত্যাশা ছিল তাকে ঘিরে। এটা সত্য, সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, তার কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে। এর সঙ্গে ছিল, নানা বিভক্তি এবং অসহযোগিতা। এটা অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ নিকট ভবিষ্যতে না হলেও, দূর ভবিষ্যতে ড. ইউনূসের শূন্যতা এবং তার শাসনামলের ভালো-মন্দ মিলিয়ে বিচার করবেন। কিন্তু এক সময় স্পষ্ট প্রমাণিত হবে, ড. ইউনূস বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রান্তিকালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন রাষ্ট্রের। সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র দেড় বছর সময়ে অনেক কিছুই তার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। তবু তিনি চেষ্টা করেছেন, নিজস্ব আদর্শ এবং মেধানুযায়ী। অনেক সফলতাও অর্জন করেছেন, যা নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাবে। পাশাপাশি দেখা যাবে, আমরা অনেকেই তাকে শুরু থেকেই বাঁকা চোখে দেখা শুরু করেছিলাম। তার বিরুদ্ধে নানা সন্দেহ, কুৎসা এবং অপমানজনক মন্তব্য করতে দ্বিধা করিনি। প্রথম দিন থেকেই তাকে আমরা সহযোগিতা করার চেয়ে, অসহযোগিতা করেছি। কিন্তু ভুলে যাই, ওই মুহূর্তে ড. ইউনূস সরকারের দায়িত্ব না নিলে আমরা অনেক বড় অস্থিরতা এবং সংকটে পড়তাম। সেটা হয়নি তার ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব পরিচিতির কারণেও। কিন্তু আমরা অধিকাংশ সময় সঠিক মানুষকে চিনতে সঠিক সময়ে ভুল করি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাদের মধ্যে যে প্রত্যাশার দীপ জ্বালিয়েছিলেন তাকে অনির্বাণ করে ধরে রাখতে পারিনি। যাই হোক, এই বিষয়ে আজকের লেখা না। নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

এই প্রত্যাশা, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং তার প্রধানকে নিয়ে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি, সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ী দলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিজয় নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং এ দেশের রাজনীতির নতুন মেরূকরণ হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই আজকের বাস্তবতা। তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকবে স্বাধীনতার সময় থেকে আরম্ভ করে, আমরা বিগত ৫৩ বছর জামায়াতের রাজনীতি বলতে যা মনে করতাম এবং দেখতাম, সেই রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে। জামায়াতে ইসলামী সংসদে সত্যিকারভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে, সরকারের যে কোনো আলোচনা ও সমালোচনার প্রশ্নে। গতানুগতিক বিরোধিতা নয় সবার আগে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে, বাংলাদেশের মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে, গণতন্ত্রকে সম্মান করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা সক্রিয় বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। জামায়াতে ইসলামী আমাদের রাজনীতিতে অতীতের ভুল এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা না দিয়ে, ইসলাম যে সব মানুষের জাগতিক ও ইহজাগতিক কল্যাণের ধর্ম, সত্য এবং ন্যায়ের ধর্ম হিসেবে তার প্রতিনিধিত্ব করবে সঠিকভাবে। এই প্রত্যাশার অনির্বাণ শিখা বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গুণগত পরিবর্তনে সহায়ক হবে, যদি এই দীপশিখা আমরা জ্বালিয়ে রাখতে পারি। এবার আসি অন্য বিষয়ে।

পরিবারের একজন হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে খুব দ্রুত ঢুকে গেছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের মানুষ এই তারেক রহমানকে আগে দেখেনি। পাশাপাশি তারেক একা নন, সঙ্গে রয়েছে তার সুযোগ্য স্ত্রী ডাক্তার জোবায়দা রহমান ও একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান। তিনজনের এই ছোট্ট পরিবারকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আনন্দের সঙ্গে এবং তাদের একান্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে নিয়েছেন মনের ভেতর থেকে। এটা অনুমান নয়, এটা নিজে দেখে এসেছি। এর কারণ হচ্ছে, বিশেষ কাজে তখন ছিলাম বাংলাদেশে। ফিরেও এসেছি, কিছুদিন আগে। ডা. জোবায়দার ব্যক্তিগত ইমেজ, তার পারিবারিক ঐতিহ্য এবং অমায়িক ব্যবহারে তিনি মুগ্ধ করেছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে। একইভাবে তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশে তার সুযোগ্য স্ত্রী এবং কন্যার সঙ্গ এবং তাদের অনুপ্রেরণা তাকে ভিন্নমাত্রায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার অনির্বাণ শিখা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে, যদি আমরা এই প্রদীপের যত্ন নিতে পারি। পাশাপাশি এই প্রদীপই আমাদের আলো দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে, আমি বাংলাদেশে থাকা পর্যন্ত তার কিছু কার্যক্রম এবং পদক্ষেপ, জনগণের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রথমত জাতির উদ্দেশ্যে তার ভাষণ, গুণগতমান বিচারে নতুন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণে যেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়েছেন, যেমন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দলীয় স্বার্থে না রাখা, প্রশাসনকে জনস্বার্থে প্রাধান্য দেওয়া এবং অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে মাফিয়াদের সাবধান করে দেওয়া, শহরে যানজট নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া, সারা দেশের রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা উন্নত করে মানুষের যাতায়াত সুবিধাকে উন্নত করা, শিক্ষিত বেকার সমস্যার সমাধানে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা বলা এবং সেটা বাস্তবায়নের সবার সহযোগিতা চাওয়া।  বিষয়গুলো আমাদের মধ্যে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের চেষ্টার কথা বলে। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক চরিত্র এবং তাদের আপাতত সফলতা ও ব্যর্থতার ব্যাপারে এ মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না। নতুন সরকারকে ন্যূনতম ১৮০ দিন সময় দিতে হবে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের যৌক্তিকতার বিচার এবং কাজের ফলাফল বিশ্লেষণের জন্য। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের যা কিছু ‘চমক’,  সেটা যেন কেবল চমক না হয়ে, বাস্তবতার রূপ পায়। কথা এবং কাজে জনগণের স্বপ্ন ও আশা যেন বাস্তবতার রূপ পায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দলীয় স্বার্থকে ব্যবহার করার দৃষ্টান্ত যেন পুনরায় চালু না হয় কোনোভাবেই। বর্তমান মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের আয়ের উৎস থেকে জানা গেছে, তাদের দায়বদ্ধতা আছে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের। যত দ্রুত সম্ভব এই বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে দেখবেন এবং সমাধান দেবেন বলে প্রত্যাশা করি। রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান না হলেও, সমাধান চেষ্টার যাত্রা এখনই শুরু করতে হবে। বিগত সরকারের আমলে, জনবিরোধী ও গণবিরোধী যে সমস্ত কাজ হয়েছে এর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তাদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্যই এটা দরকার। এর সঙ্গে ২০২৫ জুলাই সনদের বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার এবং সরকারপ্রধান আন্তরিকভাবে দৃষ্টি দেবেন। এই প্রত্যাশাও আমাদের। আপাতত যাত্রা শুরু হয়েছে শুভ পদক্ষেপে। আমাদের সমস্যা এবং সমস্যার জটিলতার কোনো অন্ত নেই। এসব সমস্যা সমাধানে সবার আগে দল কিংবা নেতা নয়, শুধুমাত্র ‘দেশ’ অগ্রাধিকার পাক, নতুন সরকারের নেতৃত্বে।

এই সরকারের নেতৃত্বে এক ব্যক্তির প্রতি আমাদের প্রত্যাশার শিখা দ- অনেক উঁচুতে। সেই শিখার উঁচু মাত্রায় আমরা যে প্রদীপ জ্বালিয়েছি, সেই প্রদীপের শিখা অনির্বাণ হোক সম্মিলিত নাগরিক ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তে। আমাদের সবার কল্যাণ হোক এবং নাগরিক ও সামাজিক জীবন আশঙ্কা ও অর্থহীন ভয়মুক্ত হোক। দেশের সব নাগরিক সব রকম নিষ্পেষণ ও বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসুক বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের আধুনিক নেতৃত্বে। একটা বই পড়ছিলাম এই সময়ের অন্যতম এক বিজ্ঞানীর। আমাদের বাংলাদেশের আরেক সুযোগ্য সন্তান, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডারটমাউথ-এর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের লেখা, ‘যে শুরুর শেষ নেই’। প্রকাশক, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, ২০২৬। এই গ্রন্থের একটি অধ্যায়ের শিরোনাম ‘নতুন সম্ভাবনা’। লেখক লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে বিরাজমান লাখ লাখ চরিত্রের প্রাণী একটা থেকে আরেকটি কোনো না কোনোভাবে পৃথক’। একইভাবে ব্যক্তিগতভাবেও আমি মনে করি, একটা সময় থেকে যখন আরেকটা সময়ের পরিবর্তন ঘটে, তখন সেখানেও নতুন সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। সেটা খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই খোঁজার পথে আমাদের সম্মিলিত ঐক্যকে আরও দৃঢ় করবেন আগামীতে এটা অন্যরকম প্রত্যাশা।

লেখক: সমাজ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত