জবাবদিহির পালা শুরু

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

বর্তমানে মানুষের প্রত্যাশা আগের চেয়ে তীক্ষè ও সচেতন। সহনশীলতা থাকলেও নির্বিকারভাবে সবকিছু মেনে নেওয়ার পুরনো অভ্যস্ততা আর নেই। কারণ, এবার ভোটে শুধু সরকার বদলের লক্ষ্য ছিল না, শাসনের ভাষা ও আচরণ বদলের প্রত্যাশাও ছিল। সরকারের এই পর্যন্ত সময়ে প্রথমেই ইতিবাচক দিকটি স্বীকার করা দরকার। নতুন সরকার এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতীকী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বুঝিয়েছে, তারা জনমতের চাপ উপলব্ধি করছে। মন্ত্রিসভার আকার ছোট রাখা, ভিআইপি প্রটোকল শিথিল করে জনদুর্ভোগ কমাতে চাওয়া, এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতো ব্যাপারগুলো তুচ্ছ নয়। এ সবের মানে এটাই রাষ্ট্র মানে শুধু ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, আচরণের জবাবদিহিও আছে। দীর্ঘকাল মানুষ রাষ্ট্রকে সেবাদাতার চেয়ে দাপটদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বেশি দেখেছে। সে তুলনায় এসব পদক্ষেপ কিছু স্বস্তি ও সতর্ক আশাবাদ তৈরি করেছে। তবে এগুলোর স্থায়িত্বই এখন আসল প্রশ্ন। মন্ত্রিসভা ছোট রাখা আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিরও নজির। কিন্তু এ সমস্ত প্রয়াস যদি বরাদ্দকৃত বাজেট, প্রশাসনিক সংস্কার ও নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা দ্রুত ম্লান হবে।

সরকার বদলালেও মাঠপর্যায়ের ক্ষমতাচর্চার অভ্যাস পুরোপুরি বদলায়নি এটা স্পষ্ট। সংঘটিত অপরাধ ইস্যুতে তদন্তের আশ্বাস আছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা কার্যকর, তা স্পষ্ট নয়। এখানে কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে আসে। দীর্ঘদিন বিরোধিতার ভূমিকায় থাকা কোনো দল ক্ষমতায় এলে তার সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়। বিএনপিকে ঘিরে প্রচলিত ধারণা এমন যে, জনপ্রিয়তা থাকলেও নীতিনির্ধারণে সুসংহত বৌদ্ধিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এ দলটি বরাবরই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে। ধারণাটি আংশিক সত্য বা অতিরঞ্জিত যাই হোক না কেন, ক্ষমতায় এসে তা অতিক্রমের দায় তাদের। অন্যদিকে, ঐতিহাসিকভাবে দলটিকে কিছুটা জনতুষ্টিবাদী বলেও দেখা হয়। অনেকে বলেন, তাদের ভেতরে মেধা বা মননের চেয়ে রাজপথের লড়াকু পরিচয়কে বেশি মূল্য দেওয়ার প্রবণতা আছে। সমালোচকরা বলছেন  প্রথম সপ্তাহের কিছু তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া এবং মন্ত্রীদের মন্তব্য, যেমন- ‘ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে ঘুরবে’ বা ‘বিদেশিরা বাংলাদেশে পড়তে আসবে’ টাইপের বাগাড়ম্বর সেই পুরনো সংশয়কে নতুন করে উসকে দিয়েছে। দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনে রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানে যে দুর্নীতি ও দালালতন্ত্রের সংস্কৃতি গেঁথে গেছে, তা দ্রুত সরিয়ে ফেলা সহজ নয়। নতুন সরকারের হাতে সময়ও অসীম নয়। এই প্রেক্ষাপটে পাসপোর্ট অফিসের ভোগান্তি কমাতে ‘নিবন্ধিত সহায়তাকারী’ নিয়োগের উদ্যোগকে দীর্ঘদিনের ‘দালাল সংস্কৃতি’র আইনি বৈধতার চেষ্টা মনে করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, বহুদিনের দালালচক্রকে নিয়ন্ত্রণের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে সমস্যার কাঠামো অক্ষুণœই থাকে। এ ছাড়া, দেশ যখন ই-পাসপোর্ট যুগে প্রবেশ করেছে, তখন নাগরিককে সরাসরি সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে নতুন মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত করা বা বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানো জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এখনো বাস্তব সমস্যা। এই সংকট কমানোর বদলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অযাচিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের শব্দচয়নে তাই বাড়তি সতর্কতা দরকার। শিক্ষামন্ত্রী অভিজ্ঞ ও দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও, শিক্ষকদের সঙ্গে তার কথা বলার ভঙ্গি এবং ‘প্রমিজ’ চাওয়ার ধরন অনেককে আহত করেছে। শিক্ষকদের উৎসব ভাতার দাবির বিপরীতে তার ‘বুল ইন দ্য গ্লাস হাউজ’ আচরণ এক ধরনের দম্ভের প্রকাশ গণ্য করা হচ্ছে। নিজের নির্বাচনী এলাকায় কিশোরদের চলাফেরায় কড়াকড়ি আরোপ ও প্রয়োজনে ‘সাংবিধানিক লঙ্ঘন’-এর হুমকি উদ্বেগজনক। সংবিধান কোনো ব্যক্তিগত দলিল নয়। এই সুযোগ নিয়ে পুলিশ যদি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বা সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করে, তখন থেকে রাষ্ট্রের কলকবজাগুলো বেহাত হতে শুরু করবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিত্যপণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশও বেড়েছে, যদিও দলীয় সূত্র থেকে বলা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য কমতে শুরু করেছে। এমন অস্বীকারের প্রবণতা, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে বুমেরাংয়ের ভূমিকা রেখেছিল। ব্যবসায়ীরা যখন সিন্ডিকেট তৈরি করে ভোক্তা অধিকারের অভিযানে বাধা দেয়, তখন যে রকম শক্ত অবস্থান প্রয়োজন সেখানেও ঘাটতি স্পষ্ট। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ইকোট্যুরিজমের ঘোষণা দেওয়ায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, পাহাড়ের মানুষের সম্মতি না নিয়ে- তাদের জমি ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে যে উন্নয়ন, তা টেকসই হবে না। নতুন সরকারের উচিত ছিল, তাদের আস্থা অর্জন করা। কিন্তু তা না করে শুরুতেই রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যুৎমন্ত্রীর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ মন্তব্য মেরূকরণের রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে আসা একটি বিপ্লবী সেøাগানকে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা ইতিহাসের ভুল।

সরকারের প্রধান কাজ এখন স্পষ্ট। ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা নির্ভর শাসনের বদলে- নিয়ম, প্রোটোকল ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার। ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হলে এবং মন্ত্রীদের তোষামোদ চলতে থাকলে, রাজনৈতিক অবক্ষয় ঘটতে পারে। যা জুলাই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দল ও সরকারের সীমানা স্পষ্ট করা, নেতাকর্মীদের প্রশাসনে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক করা জরুরি। নির্বাচনে যেভাবে মানুষ ভোট দিয়েছে, তা আদর্শিক নয় বরং স্থিতিশীলতার কৌশল। একদিকে মৌলবাদিতার উত্থান ঠেকানো, অন্যদিকে দলীয় দখলদারিত্ব রোধ দুই দায়িত্বই এখন সরকারের। আইন প্রয়োগ যদি দলীয় পরিচয় দেখে হয় বা সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে গণ্য হয়, তবে ভারসাম্য নষ্ট হবে। গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতার মূল মাপকাঠি হলো সমালোচনার স্বাভাবিকতা ও আইনের নিরপেক্ষতা। ইতিহাসের একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলগুলো প্রথমে জনসমর্থনের ওপর ভর করে, পরে সেটাকে স্থায়ী ধরে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের কোণঠাসা করে। তখন আর তাদের প্রতি জনসমর্থন থাকে না, থাকে নীরব ভীতি। এতে করে জুলাইয়ের মতো অনিবার্য কোনো অভ্যুত্থান এসে সবকিছু তোলপাড় করে ফেলে। এই কারণে, নতুন সরকারের আসল পরীক্ষা ক্ষমতার স্থায়িত্ব নয়, বরং এখতিয়ারের সীমা স্বীকার করে নেওয়া। রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয় এই উপলব্ধিই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা।

লেখক : গবেষক ও অনুবাদক

[email protected] 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত