বাংলা কবিতার আধুনিক পরিসরে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এক ব্যতিক্রমী নাম। বাংলাদেশে জন্ম, শিক্ষায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব এবং দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস এই ত্রিমুখী অভিজ্ঞতা তার কবিতাকে দিয়েছে এক জটিল সাংস্কৃতিক ও ভাষিক গভীরতা। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, অনুবাদক ও সম্পাদক; আবার পাঠকের একাংশের কাছে তিনি দুর্বোধ্য, কঠিন ও অতিরিক্ত বৌদ্ধিক বলেও চিহ্নিত। তবু অস্বীকার করার উপায় নেই, তার কবিতা বাংলা ভাষার প্রচলিত আরামদায়ক পাঠভঙ্গিকে ভেঙে দেয়।
তার কবিতায় জীবন কোনো স্বচ্ছ রেখা নয়, বরং তা দায়, ঋণ, সংশয় ও আত্মপ্রশ্নে ভরা। ‘পুলিপোলাও’ তার সেই কবিতাচিন্তার একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থ, যেখানে ভাষা নিজেই একটি সংকটময় অস্তিত্ব হিসেবে উপস্থিত।
‘পুলিপোলাও’ রচনার পেছনে কবির মানসিকতা কোনো প্রথাগত দেশপ্রেমের আবেগ থেকে উৎসারিত নয় এ কথা তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন। জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা তার কাছে পেট্রিয়টিক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক ধরনের ‘ঘরের আকাক্সক্ষা’ যা ফ্রয়েডীয় অর্থে মাতৃজরায়ুতে ফেরবার অচেতন তাড়নার সঙ্গে তুলনীয়। এই আকাক্সক্ষা রাষ্ট্র, জাতীয় প্রতীক বা গৌরবের দিকে মুখ ফেরায় না; বরং তা নিবদ্ধ থাকে একান্ত ব্যক্তি গত স্মৃতি, শরীরী অভাব ও ফেরার অসম্ভব টানের দিকে। ফলে ‘পুলিপোলাও’-এ বাংলাদেশ কোনো রাজরাজেশ্বরী মূর্তি হয়ে ওঠে না; হয়ে ওঠে নীরব, অনাড়ম্বর, ব্যক্তিগত এক মাতা, যার কাছে ফেরার আকুলতা আছে, কিন্তু নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের আশ্বাস নেই। এই দ্বৈত অবস্থান ফেরার ইচ্ছে ও দূরত্বের স্বীকৃতিই গ্রন্থটির কাব্যিক স্নায়ু।
এই গ্রন্থে জীবন নিজেই একটি সমস্যার নাম। কবি জীবনের দিকে তাকান দায় ও অনুশোচনার চোখে। তিনি লেখেন, ‘অথচ আমি পেয়েছি কেবল পুরনো ও/অলস ভৃত্যের মতো নিত্যকার একখানা দায়,/জীবনের প্রতি এক গূঢ় অসততা।’ এখানে জীবন কোনো স্বাভাবিক প্রবাহ নয়; বরং এক ক্লান্ত, অভ্যাসগত দায়িত্ব, যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে এক ধরনের নৈতিক অসততা। বেঁচে থাকাটাই যেন প্রশ্নবিদ্ধ। এই দৃষ্টিভঙ্গি ‘পুলিপোলাও’কে আবেগময় বা রোমান্টিক কাব্যের জায়গা থেকে সরিয়ে এনে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী অনুসন্ধানে স্থাপন করে।
জন্মের ধারণাটিও এখানে উৎসব নয়, বরং ঋণ। কবি বলেন, ‘আমি তো জানি না, আজও আমার জন্মের ঋণ কারা কোন আসমানেতে শোধে।’ এই পঙ্কতিতে ঈশ^রের উপস্থিতি আছে, কিন্তু আশ^াস নেই। ‘আসমান’ শব্দটি আধ্যাত্মিকতার ইঙ্গিত বহন করলেও, তা কোনো নিষ্পত্তি দেয় না। জন্ম এখানে এক অমীমাংসিত দেনা, যার হিসাব কোথাও মেলে না। এই অনিশ্চয়তা কবির ঈশ্বরভাবনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে বিশ্বাসের বদলে সংশয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে।
প্রেম এখানে স্থায়ী কোনো অভিজ্ঞতা নয়; তা স্মৃতির ভেতর ভেসে ওঠা এক অস্পষ্ট ঢেউ। কবি স্মরণ করেন
‘কবে তোর ফিরুজা চুলের
বিপরীত ঢেউ এসে আমারে ভাসাল নিরুদ্দেশে,
তার দিনক্ষণ আর মনে নাই, তবু সেই পেলব ভুলের
আরক্ত মাসুল গনি আজও দিন শেষে,
প্রেমের সময়কাল ভুলে গেছেন, কিন্তু তার ‘মাসুল’ আজও গুনতে হচ্ছে। এখানে প্রেম অপরাধের মতো, যার শাস্তি দীর্ঘস্থায়ী। এই অনুশোচনার ভাষা গোমেজের কবিতাকে রোমান্টিক না করে, বিষণœ ও আত্মসমালোচনামূলক করে তোলে।
প্রবাস ‘পুলিপোলাও’-এর একটি কেন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা, কিন্তু এই প্রবাস নস্টালজিক নয়। কবি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মনে পড়ে, এই দেশ, এ আমার নয়।’ তবু তিনি এই মাটিকে খুঁটিয়ে দেখেন, এর রঙ, প্রকৃতি, আলো, সবকিছু গ্রহণ করেন। তবু শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন, নিজের দেশে যা দেখেননি, তা এখানে দেখছেন। ফলে তিনি ‘এই দূর আকাশের আঁচে’ বাজিয়ে নেন নিজের বোধ। এই দ্বন্দ্ব, গ্রহণ ও অস্বীকার, প্রবাসী চেতনার একটি পরিণত রূপ, যেখানে দেশ আর নিরাপদ আশ্রয় নয়, আবার সম্পূর্ণ বর্জনীয়ও নয়।
দেশের স্মৃতি ফিরে আসে, শান্তির নয়, বরং এক ধরনের অস্বস্তিকর সুরে। কবি লেখেন, ‘স্বদেশবন্ধুর কথা মনে পড়ে খুব : /যখনই সন্ধ্যার মুখে অলৌকিক সার্কুলার কী-তে/ভয়াল সঙ্গীত বাজে চিনা সারেঙ্গিতে,’। এখানে দেশ-স্মরণ মানে আরাম নয়; বরং এক ভয়াল সাংস্কৃতিক কম্পন। প্রবাসের ভেতর দিয়ে দেশ হয়ে ওঠে হাইব্রিড, ভাঙা, অস্বস্তিকর, যেন পরিচিত সুরও আর আগের মতো নেই।
কবির আত্মপরিচয়ও স্থির নয়। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কে-যে আমি, কেন আমি, জানি নাই, মন!’ এই প্রশ্নের উত্তরে আসে ইতিহাসের ইঙ্গিত ‘ছেচল্লিশ সুতায় কেবা সে/আমারে [নাচায়]।’ এখানে ব্যক্তিসত্তা ইতিহাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণ ভালোবাসা, না-কি নিষ্ঠুরতা, সে প্রশ্নের উত্তর কবির কাছেও স্পষ্ট নয়। এই দ্বিধাই তার কবিতাকে মানসিকভাবে গভীর করে তোলে।
‘পুলিপোলাও’-এ পুরাণও নতুন রূপ পায়। কবি বলেন, ‘আমিই বেহুলা আর আমি লখিন্দর।’ এখানে তিনি একই সঙ্গে উদ্ধারক ও মৃত, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়। নিজেকে ‘সুবিধামতো গাঙুড় বানিয়ে’ তিনি নিজেরই মান্দাসে ভেসে চলেছেন। এই আত্মরূপক আধুনিক মানুষের আত্মসংগ্রামের এক শক্তিশালী চিত্র, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যের বাহক ও ভুক্ত ভোগী।
এসব কিছুর সমন্বয়ে ‘পুলিপোলাও’ হয়ে ওঠে এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যা পাঠককে স্বস্তি দেয় না, বরং সচেতনভাবে অস্বস্তির মধ্যে রেখে দেয়। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ভাষা প্রথম পাঠে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে, কিন্তু এই দুর্বোধ্যতা কোনো প্রদর্শনমুখী অলংকার নয়; এটি অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা ও মানসিক জটিলতারই অনিবার্য ভাষা। তার কবিতা সহজ অর্থ বা প্রস্তুত সিদ্ধান্ত হাজির করে না, বরং পাঠককে প্রশ্নের এক অনির্দিষ্ট ভূগোলে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে অনুভব ও চিন্তা পরস্পরের মুখোমুখি হয়। এই অর্থেই ‘পুলিপোলাও’ বাংলা কবিতায় এক প্রয়োজনীয় অসুবিধা, যা পাঠকে আরাম দেয় না, কিন্তু বোধকে প্রসারিত করে।