রোজা ফরজ হওয়ার উদ্দেশ্য

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১১ এএম

রোজা ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। রোজা ফারসি শব্দ। এর অর্থ উপবাস করা। কোরআন হাদিসে এটিকে সিয়াম বলা হয়েছে, যার অর্থ বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাই হলো সিয়াম বা রোজা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা ১৮৩) সুতরাং রোজা ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের জন্য।

রমজান হলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে মুসলমানরা বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি, দান-সদকা ও নেক আমলে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। রমজান মাসে লাইলাতুল কদরের রাতটি অত্যন্ত পবিত্র। এই রাতে কোরআন মাজিদের নাজিল শুরু হয়েছে।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স তখন ৪০ বছর ছিল এবং এটি ঘটেছিল ৬১০ খ্রিস্টাব্দে। কোরআন মাজিদের পুরো অবতারণা সম্পন্ন হতে প্রায় ২৩ বছর সময় লেগেছিল। রমজান মাসে লাইলাতুল কদরের নিশ্চিত রাতটি ঠিক জানা যায়নি, তবে হাদিস অনুযায়ী রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোকে লাইলাতুল কদরের রাত হিসেবে ধরা হয়। তবে ২৭ তারিখ রাতকে মুসলমানরা বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে লাইলাতুল কদর হিসেবে। এই রাতের বিশেষত্ব হলো, যে ব্যক্তি ইমানের সহিত ইবাদত, দোয়া, নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির করবে তার সওয়াব অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই মুসলমানরা এই রাতগুলোতে অধিক ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত এবং দোয়া-মোনাজাত করে থাকে।

কোরআন হাদিসের আলোকে রোজা রাখার বিধান অনেক আগে থেকেই রয়েছে।  হজরত আদম (আ.)-এর সময় প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতে হতো। আদম ও হাওয়া (আ.) জান্নাতে থাকাকালীন একটি নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং পরে তাদের গায়ের রঙ কালচে হয়ে যায়। তারা এই ফল খাওয়ার কারণে তওবা করেন এবং সে জন্যে ৩০ দিন পর্যন্ত রোজা রাখেন। ৩০ দিন পর তাদের তওবা কবুল হয়। তারপর থেকে তাদের সন্তানদের ওপর ৩০টি রোজা রাখা ফরজ করে দেওয়া হয়।

হজরত নুহ (আ.)-এর ওপরও রোজা ফরজ ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, হজরত নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ) হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তার ওপর অহি নাজিল করেন এবং আরও দশ ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। অন্যদিকে হজরত ইদ্রিস (আ.) বছর জুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন পরপর রোজা রাখতেন।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) মদিনায় আগমন করার পর শুধু আশুরার রোজা রাখতেন। তিনি মদিনায় হিজরত করে দেখলেন, মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আজকে তোমরা কীসের রোজা রাখছ? উত্তরে তারা বলল, আজ সেই দিন যেদিন মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও তার কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন, আর ফেরাউনকে সদলবলে নীল দরিয়ায় ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শোকরিয়া স্বরূপ এ দিন মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এ দিন রোজা রাখি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমরা তোমাদের থেকে মুসা (আ.)-এর অনুসরণের অধিক হকদার। এরপর তিনি আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। (সহিহ বুখারি) অতঃপর যুগ যুগ ধরে রোজার বিধান প্রচলিত রয়েছে।

রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ সন্তুষ্টি  অর্জন করা। সারাদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ নিজের নফস ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এতে ধৈর্য, সহনশীলতা ও নৈতিকতা বৃদ্ধি পায়। রোজা মানুষকে মিথ্যা, গিবত, ঝগড়া-বিবাদসহ সব ধরনের অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে শেখায়।

লেখক : সদস্য, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি (আরসিআরইউ)

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত