পটুয়াখালী জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় ওয়াশ ব্লক নির্মাণে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) পটুয়াখালী অফিসের বিরুদ্ধে। বহু বিদ্যালয়ে আংশিক কাজ করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।
অভিযোগের বিষয়ে তথ্য জানতে ডিপিএইচই পটুয়াখালী অফিসে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কালক্ষেপণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য দেওয়া হয়নি। ২৫ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, বরিশাল বরাবর আপিল করার পর চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি তথ্য সরবরাহ করা হয়।
সরবরাহ করা তথ্যে দেখা যায়, জেলায় ২০২১ সাল থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে মোট ৬৩৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৬১টি শতভাগ সম্পন্ন ও হস্তান্তর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বাকি ৩৭৮টি বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) ও অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক ওয়াশ ব্লক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক টয়লেট এবং মেয়েদের জন্য ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা নিশ্চিত করা।
প্রতিটি একতলা ও দোতলা ওয়াশ ব্লক নির্মাণে সর্বোচ্চ প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। সেই হিসেবে ৬৩৯টি বিদ্যালয়ে একটি করে ওয়াশ ব্লক নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১১৫ কোটি টাকার বেশি। ইতিমধ্যে বিপুল অঙ্কের টাকা উত্তোলন করা হলেও অর্ধেকের বেশি কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সরেজমিনে বাউফল উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের হাতেম মৃধা হাট ভিডিসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ওয়াশ ব্লকের একতলা অবকাঠামো নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে। পাশে তৈরি করা ট্যাংকির গর্তে পানি জমে মশার উপদ্রব সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিম্নমানের কাজের ওপর আবার সাত-আট মাস ধরে কাজ বন্ধ। রাতে এখানে মাদকাসক্তদের আড্ডাও বসে।’
সহকারী শিক্ষক নাসরিন আক্তার জানান, বিদ্যালয়ে ১১৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬২ জনই ছাত্রী। নতুন টয়লেট না থাকায় সবাইকে পুরনো টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
উপজেলার দক্ষিণ মহাশ্রাদ্ধি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রধান শিক্ষক মো. কুদ্দুস মিয়া জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে কাজ আংশিক অবস্থায় পড়ে আছে। বিদ্যালয়ের ১৭৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৯ জন কন্যাশিশু। এ ছাড়া ৫ জন নারী শিক্ষক রয়েছেন। সবাইকে পুরনো ও অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মানতাসা ইয়াসমিন বলে, ‘নতুন টয়লেট না থাকায় দুর্গন্ধযুক্ত পুরনো টয়লেট ব্যবহার করতে হয়।’
দশমিনা উপজেলার বেতাগীসানকিপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর মাছুয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ওয়াশ ব্লকের কাজ বন্ধ রয়েছে। সহকারী শিক্ষক নাঈমা জাহান জানান, বিদ্যালয়ের ২৫৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৯ জন কন্যাশিশু। দ্রুত কাজ শেষ না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।
প্রকল্পে কাজ করা কয়েকজন ঠিকাদার মোবাইল ফোনে জানান, দ্রুত অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করা হবে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে কাজ বন্ধ রেখেছেন। আবার কেউ কেউ আংশিক কাজ করে কাজের বিপরীতে বেশি বিল উত্তোলনের পর আর কাজে ফিরছেন না।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লাইজু আক্তার বলেন, অনেক বিদ্যালয় থেকেই ওয়াশ ব্লক নিয়ে অভিযোগ আসছে। ডিপিএইচইকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। শতভাগ সম্পন্ন দেখানো কিছু বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গিয়ে কাজের মান নিম্নমানের পাওয়া গেছে।
তবে ডিপিএইচই পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘ওয়াশ ব্লক নির্মাণে কোনো সমস্যা নেই। কাজ শেষপর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ হবে।’