ব্যাংক খাতের দুঃসময় এবং বিশ্লেষণ

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীন হতো, তাহলে ব্যাংক জালিয়াতি ও মুদ্রাস্ফীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার দ্রুত অবমূল্যায়নের সেই পুরনো দুঃসময়ে ফিরে যেতে কে চায়? ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বিভিন্ন পত্রিকা জানায় যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৪ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।  অর্থাৎ প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন টাকা (৬ লাখ কোটি টাকা)। এটি প্রায় কল্পনাতীত পরিমাণ অর্থ, যা ১৯টি পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য যথেষ্ট। এ কারণে অনেক ব্যাংককে সরকারি অর্থ দিয়ে উদ্ধার (বেইলআউট) করতে হবে, নইলে তারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠরা বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল। তারা এই অর্থ ব্যবহার করেছে অতিমূল্যায়িত (ওভার- ইনভয়েসড) আমদানি ব্যয় পরিশোধ করতে। এর মধ্য দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার করে দেওয়ায়, পরবর্তীকালে তারা ঋণখেলাপি হয়ে যায়। এটাই ব্যাংকিং খাতে সংকটের জন্ম দেয় এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টাকার অবমূল্যায়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ত, বেইলআউটের ব্যয়ের হিসাব করা কঠিন নয়। এ বাবদ ব্যাংকগুলোকে আনুমানিক প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন টাকা সরকারি তহবিল থেকে দিতে হবে, যাতে তারা অন্তত জনসাধারণের আমানত ফেরত দিতে পারে। এটি না করলে, ব্যাংকে অস্থিরতা দেখা দেবে এবং ব্যাংক চালানো কঠিন হতে পারে। নতুন সরকার টাকা ছাপালে আরও মুদ্রাস্ফীতি ও অবমূল্যায়ন ঘটবে। বিকল্প হিসেবে সরকার সম্ভবত বন্ড বিক্রি করে এই অর্থ সংগ্রহ করবে। সুস্থ ব্যাংকগুলো এসব বন্ড কিনবে, কারণ সরকারি বন্ড ব্যবসায়িক ঋণের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সরকার যখন ট্রিলিয়ন টাকার বন্ড বিক্রি করবে, তখন বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর টাকায় টান পড়বে। এর বিরূপ প্রভাবে আগামী কয়েক বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হতে পারে।

নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ভবিষ্যতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দরকার।  যাতে সরকারের ঘনিষ্ঠরা কোনোভাবেই ব্যাংক লুট করতে না পারে। এ ছাড়া স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে এবং টাকার অবমূল্যায়ন রোধে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে দেশকে বড় আর্থিক ঘাটতির মুখে দাঁড় করিয়েছিল এবং অন্যদিকে একক অঙ্কের সুদহার বেঁধে দিয়ে ব্যাংকগুলোকে কম সুদে ঋণ দিতে বাধ্য করেছিল। যেকোনো অর্থনীতিবিদই একমত হবেন যে, বড় আর্থিক ঘাটতি ও কম সুদের হার একসঙ্গে থাকলে, মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন অনিবার্য। যেসব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন, সেখানে বড় আর্থিক ঘাটতি থেকে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় তারা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সুদের হার বাড়িয়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নীতিসুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি সফলভাবে থামিয়েছে। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিত, তাহলে গত কয়েক বছরের অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার অবমূল্যায়ন এড়ানো যেত। এই সমস্যা সমাধানে, বিএনপি সরকার কোন ধরনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক : পরিচালক, কাজী ফার্মস লিমিটেড

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত