বর্ষাকালের এক দিন। আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ। মাঝে মাঝে রিমঝিম করে বৃষ্টি নামে। তনিমা আর তৌহিদ দুই ভাইবোনই চঞ্চল ও দুষ্টুমি প্রিয়।
তনিমা বড় বোন। সে ক্লাস ফাইভে পড়ে। আর তৌহিদ পড়ে ক্লাস ওয়ানে। ওদের খুনসুটি, ঝগড়া-বিনোদন সারাদিন চলে। একটু পরেই মিটে যায়। হাসিমুখে আবার খেলায় মেতে ওঠে দুজন।
তনিমা তার ভাইকে খুব ভালোবাসে। কখনো কোলে নেয়, কখনো ভাত খাইয়ে দেয়। আর তৌহিদও বোনকে দেখে দেখে অনেক কিছু শেখে।
বর্ষার কারণে বাড়িতে কয়েকটা রঙিন ছাতা কেনা হয়েছে। বাবা-মা তাদের আপন আপন ছাতা ব্যবহার করেন। বৃষ্টির পরে ছাতাগুলো ফ্যানের নিচে মেঝের ওপর শুকোতে দেওয়া হয়। তৌহিদ লক্ষ করেছিল বাবা ছাতার হাতলের বোতামে চাপ দিলেই ছাতাটি ঝট করে খুলে যায়! এই যন্ত্রটা কীভাবে কাজ করে তা দেখার জন্য ওর খুব কৌতূহল জাগে।
একদিন দুপুরবেলা।
তনিমা টেবিলে বসে বই পড়ছে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাবা অফিসে গেছেন। এদিকে তৌহিদ লুকিয়ে একটা ছাতা নিয়ে খেলছে। সে বারবার বোতামে চাপ দিচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে ছাতার হাতল সজোরে খুলে যাচ্ছে।
তৌহিদের বেশ মজা লাগছে! হঠাৎ তার মাথায় আসে ‘এইটা আপুকে দেখাই!’
চুপিচুপি গিয়ে বলে, ‘আপু, এই দেখো!’
তনিমা ঠিকমতো তাকানোর আগেই ঠাস করে ছাতার হাতল গিয়ে সজোরে বিঁধে তার ডান চোখে। সে চিৎকার করে ওঠে, ‘আঃ! আমার চোখ গেল! আমার চোখ! আমাকে বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও!’
সে মেঝের ওপর গড়াগড়ি খায়। চোখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। ব্যথায় সে ছটফট করতে থাকে। মুহূর্তেই তার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে।
মা দৌড়ে এসে দেখেন ব্যথায় ছটফট করছে তনিমা। তাড়াতাড়ি মেয়েকে কোলে তুলে নেন। ততক্ষণে পাশের বাড়ির লোকজন এসে পড়ে। দ্রুত তনিমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তৌহিদ ভয়ে এক কোণে চুপ করে বসে যায়। মুখে কথা নেই, চোখে পানি টলমল করছে। ওর হাতে ধরা ছাতাটি পড়ে থাকে। ওর মনে হচ্ছে, ‘সবাই ওকে দোষ দেবে। মা তাকে মার দেবে! আর আপু তাকে আর কোনো দিন ভালোবাসবে না।’
খবর পেয়ে বাবা অফিস থেকে হাসপাতালে ছুটে যান।
ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন, ‘চোখটি থেঁতলে গেছে, দ্রুত অপারেশন করতে হবে।’
অপারেশন করা হয়। অপারেশন সফল হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য! তনিমা প্রাণে বেঁচে যায় ঠিকই। কিন্তু তার চোখটি বাঁচানো সম্ভব হয় না। সে আর কক্ষনো ওই চোখ দিয়ে দেখতে পাবে না।
কয়েক সপ্তাহ পর তনিমা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে নিজের একচোখা প্রতিবিম্ব মনোযোগ দিয়ে দেখে। হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
‘আমি তো আর আগের মতো দেখতে পারি না!’ বলেই সে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মা তাকে আদর করে আর সান্ত্বনা দেয়।
পেছন থেকে তৌহিদ এসে তনিমার হাত ধরে বলে, ‘আপু, আমি ভুল করেছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও!’
তনিমা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘তুই ছোট, তাই না বুঝেই ভুল করেছিস। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবি যে জিনিস ভালোভাবে বুঝিস না, সেটা নিয়ে কক্ষনো খেলতে যাবি না। কৌতূহল থাকলে জিজ্ঞেস করবি, কিন্তু ভুল করে বিপদ ডেকে আনবি না। কোনো কোনো সময় ছোট ভুল বড় বিপদ ডেকে আনে। যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। আমার বেলাতে তা-ই হয়েছে।