যুদ্ধের দামামা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:২৪ এএম

যুদ্ধের দামামা বাজছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার শিখ-ি ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খামেনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরানি সরকারি টিভি। আর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, এর কঠিন জবাব দেওয়া হবে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। আক্রান্ত ইরান আত্মরক্ষার পাশাপাশি নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত। ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে নিপতিত। বিশ্ব জুড়ে বেসামরিক বিমান চলাচলে নেমে এসেছে সংকট। হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে আটকা পড়েছে শিডিউল ক্যানসেল হওয়ায়। বাংলাদেশ বিমানের মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমানের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও নেমে এসেছে হতাশা। যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ধসে পড়েছে মার্কিনি-ইসরায়েলি যৌথ হামলায়।

ইরানের শাসক পরিবর্তন করার ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আগ্রাসন, এক উগ্র মস্তিষ্কের ধ্বংসাত্মক  আস্ফালন। কারণ সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামই যেখানে সবচেয়ে প্রধান, সেখানে ইরানের শাসক পাল্টে দিয়ে কী ফায়দা তিনি অর্জন করবেন? ভেনেজুয়েলার মতো, তেলের দখল নেওয়ার জন্যই ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং সে দেশে একটি মার্কিনি শিখন্ডি সরকার কায়েম করতেই হামলা চালানো হয়েছে। আবার ইরানের সাবেক শাসক, রেজা শাহ পাহলবীর পুত্রকে ক্ষমতায় বসিয়ে তিনি লুটে নিতে চান ওই দেশের খনিজ সম্পদ। তার তেল-ক্ষুধার মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক শক্তি কায়েম করা, তা সবাই বুঝতে পারে। কিন্তু এ রকম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করার কোনো ভাষা নেই। মুক্তবুদ্ধি ও উদার গণতান্ত্রিক দেশের যে ধ্যান ও ধারণা আমরা পোষণ করি, ট্রাম্প সেই  পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। যদিও বলা হয় যে, ইরান যাতে পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই এই যুদ্ধ। আবার এই ব্যাখ্যাও আছে ইরানি তেল কেনে চীন। চীনের তেলশক্তি প্রতিহত করতেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছে। তার সুবিধা এখানে যে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ট্রাম্পের পক্ষপুটে মরা ঈগলের মতো শুয়ে আছে। মুসলমানের মধ্যে যে এই অনৈক্য ও বিরোধ, ট্রাম্প তাকে কাজে লাগাচ্ছেন। ওপেক এবং ওআইসির তৎপরতা বন্ধ। জাতিসংঘ না-হক যুদ্ধের বিরুদ্ধে, কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ। ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য, এই যুদ্ধ অনেক সমস্যার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। তেল-গ্যাসের চালানগুলো আসে কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব থেকে। ব্যবহৃত হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের কারণে তেলবাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। সেই সংকট পড়বে দেশের শিল্প-উৎপাদন, বাণিজ্যের কর্মধারায়। চরম দুর্বিপাকে পড়বে আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নতুন সরকার নতুন প্রণোদনা নিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, আমাদের গলার কাঁটা হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন, মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সত্যই যদি ইরানের হাতে পর্যাপ্ত পারমাণবিক মিসাইল থাকে, তাহলে এই সংঘাত বৈশ্বিক যুদ্ধে মোড় নিতে পারে। রাশিয়া ও চীন চুপচাপ থাকলেও, মার্কিনি ঔদ্ধত্য ও তাদের সামরিক এবং বাণিজিক স্বার্থে কোন ভূমিকায় নামবে, তা বলা মুশকিল। রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু তাদের সামরিক সক্ষমতার অনেকটাই ব্যয় হয়ে গেছে, ইউক্রেন যুদ্ধে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কী অবস্থা দাঁড়ায়, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে যে গতি চলছে, তা ব্যাহত হবে। অর্থনীতি বিপুল চাপের মধ্যে পড়বে, যা দেশের জন্য ক্ষতির। যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে ভূরাজনীতি বিশ্লেষণ করে, সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত