ইসরায়েলি গুপ্তচর ও সিআইএর চেষ্টার ফল

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

ইসরায়েল ও ইরানের বিরোধ ঐতিহাসিক। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ বৈরিতা ইতিহাস রয়েছে। দুই দেশই একে অন্যকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। বিভিন্ন সময় দেশটি প্রকাশ্যে খামেনিকে হত্যা করতে চাওয়ার কথাও বলেছে। গত শনিবার তেহরানের একটি কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে সে লক্ষ্য পূরণ করেছে ইসরায়েল। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ইসরায়েলকে ইরানের ভেতর থেকে সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) আড়িপাতার তথ্য খামেনি হত্যা পরিকল্পনা সফল করেছে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর নজর রাখছে এবং সেখানে তথ্যদাতা, গুপ্তচর ও লজিস্টিকসের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এ নেটওয়ার্কের সহায়তায় তারা এর আগে ইরানে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে লেগে ছিল। গত ছয় মাস ধরে এজন্য তাদের প্রযুক্তিগত ও জনবল সহায়তা দেয় সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ গোয়েন্দা এবং কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্যে শনিবার চূড়ান্ত ওই অভিযান চালিয়েছিল তারা।

ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়া ‘ইরানের শীর্ষস্থানীয় সাতজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ এবং খামেনির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় এক ডজন সদস্য এ হামলায় নিহত হন। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় একই সময়ে চালানো একাধিক হামলায় খামেনিসহ তাদের হত্যা করা হয়। এ ছাড়া এই হামলায় ইরানের আরও ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন। তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতনের লক্ষ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে বিমান হামলা শুরু করেছে, তার সূচনা করা হয়েছে ৮৬ বছর বয়সী দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে এক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপকে সম্ভাব্য কৌশলগত একটি ভুল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রবল প্রতিপক্ষের উত্থান ঘটতে পারে। গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলি বিশ্লেষক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, সমস্যা হলো, ইসরায়েল গুপ্তহত্যার প্রেমে মগ্ন এবং আমরা কখনোই শিখিনি যে এটি কোনো সমাধান নয়। আমরা হামাসের সব নেতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু তারা এখনো টিকে আছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। নেতাদের শূন্যস্থান সবসময়ই পূরণ হয়ে যায়।

বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এর আগে কখনোই তারা কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেনি। এর মধ্যে রয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান দিয়ে প্রত্যন্ত রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে থাকা ইরানের এক শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল কম্পিউটারগুলোতে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া পারমাণবিক নথির আর্কাইভ চুরির ঘটনাও রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালে তেহরানের একটি সরকারি গেস্টহাউজে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়ার কক্ষে বোমা রেখে তাকে গুপ্তহত্যা করা হয়। গত বছর জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি গুপ্তচররা ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের বাড়িঘর শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। এ তথ্যের ভিত্তিতে চালানো আকস্মিক হামলার প্রথম ঢেউয়েই ডজনখানেক কর্মকর্তাকে হত্যা করে তারা।

ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন সাম্প্রতিক হামলাকে ‘কৌশলগত ও অভিযানগত এক বিশাল চমক’ বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণ ধারণা ছিল, জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করা সেই আকস্মিক হামলার মতোই ইসরায়েল হয়তো রাতের আঁধারে হামলা চালাবে। হামলার সময় শনিবার সকাল বেছে নেওয়া হয়েছিল সিআই এজেন্টদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সে সময় তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে নেতৃত্বস্থানীয় একজনের কার্যালয় চত্বরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনি ঠিক কখন ওই স্থানে থাকবেন এবং বৈঠকের সময় সম্পর্কে সিআইএ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল। ইসরায়েলি গুপ্তচররাও অনেক বছর ধরে খামেনির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তারা তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্য, সহযোগী, মিত্র এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নথি তৈরি করেছিল। সিআইএর সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি বিশাল জিগস পাজলের মতো। আপনি তথ্যের এ ছোট ছোট টুকরো এক জায়গায় মেলাবেন। যেখানে আপনার কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকবে না, সেখানে আরও গভীরভাবে খুঁজবেন। এতে সবকিছুই থাকে কীভাবে তারা খাবার সংগ্রহ করে, তাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার কী হয়। সিআইএর সাবেক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও উপাত্তের এত বেশি স্তর রয়েছে যে, কেউই কোনো না কোনো সূত্র রেখে যাওয়া ছাড়া থাকতে পারে না। আপনি যা-ই করেন না কেন, তার একটা ছাপ থেকে যায়।

ইরান নিয়ে কাজ করে আসা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক রুয়েল গেরেখত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এ অভিযানে বিশাল প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এসেছিল। তবে মূলত ইসরায়েলই মাঠপর্যায়ে এমন এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিল। গেরেখত আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য। ইসরায়েলি বিশ্লেষক মেলম্যান বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে মোসাদ তাদের কৌশলে এক বড় পরিবর্তন আনে। তারা ইরানের ভেতর থেকেই স্থানীয় চর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দেয়। ২০২১ সাল থেকে মোসাদের নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডেভিড বার্নিয়া গুপ্তচরদের নিয়ে একটি ‘ফরেইন লিজিয়ন (বিদেশি বাহিনী)’-এর জন্য বিশেষ বিভাগ তৈরি করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে তাদের মোতায়েন করা হয়। মেলম্যানের মতে, ইরানে এ ধরনের চর নিয়োগ করা অনেক সহজ ছিল। কারণ, সেখানকার অনেকেই ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী। ইসরায়েল গত বছরই খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি নিতে এবং কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার বিষয়ে মিত্রদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তাতে তখন সায় দেননি। তবে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর গত বছরের সেই সংক্ষিপ্ত সংঘাত শেষ হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত