ট্রাম্প কী বললে কী বোঝায়

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

অনেকেই ভুল করে বিশ্বাস করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ কম পছন্দ করেন অথবা তিনি তেহরানের কাছ থেকে সীমিত ছাড় আদায়ের জন্য গোপন বলপ্রয়োগের কূটনীতি অনুশীলন করছিলেন। ট্রাম্প হয়তো কিছু অসামরিক বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি এমন বিষয় অথবা ব্যক্তিদের দ্বারা প্রভাবিত, যা বা যারা তাকে দ্রুত বিজয় ও গৌরব অর্জনের সম্ভাবনার দেখায়। ইরান এমন বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। আর তার কট্টরপন্থি উপদেষ্টারা, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে তাকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের কাছে তার একটি বক্তব্য নিয়ে বেশ কথা হচ্ছে। সেটা উত্তেজনার মুহূর্তে কোনো ক্ষণস্থায়ী কথার কথা ছিল না। এটি এমন একজন ব্যক্তির ঘোষণা ছিল, যিনি যুদ্ধকে একটি টানাটানির রশি হিসেবে দেখেন, যা তিনি ইচ্ছামতো টানতে বা ছেড়ে দিতে পারেন। যখন তিনি বলেন যে ইরানে সামরিক পদক্ষেপের পথে তার ‘একাধিক বাধা’ রয়েছে এবং তিনি ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে’ পারেন বা ‘দুই বা তিন দিনের মধ্যে সবকিছু শেষ করতে’ পারেন, তখন তিনি এমন একটি রাজনৈতিক নাটক মঞ্চস্থ করছেন, যতটা সামরিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে করা সম্ভব।

এটি এমন একজন প্রেসিডেন্টের ভাষা, যিনি পরিস্থিতি বা অন্যকে বোঝার চেষ্টা করেন না, বরং ভয় পাওয়াতে চান। এ ধরনের আলোচনায় হেয়ালি বা অস্পষ্টতা একটি অস্ত্র হয়ে ওঠে।

ট্রাম্প মাঝে মাঝে দীর্ঘ যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন এবং একই সঙ্গে দ্রুত হামলার পরামর্শ দেন। তিনি আসলে প্রতিপক্ষকে এমন দুটি দরজা দেখান, যা দুটি অজানা পথের দিকে নিয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি চান না ইরান জানুক যে যুক্তরাষ্ট্র সীমিত সামরিক অভিযানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে। তিনি চান তেহরানকে একটি ধূসর অঞ্চলে আটকে রাখতে, যা তিনি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন এবং চাপের হাতিয়ারে পরিণত করেছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার মতো ঘটনার পর যখন ট্রাম্প ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণ’ করার কথা বলেন, তিনি তখন আমেরিকার পুরনো সেই ভাবমূর্তি পুনরুজ্জীবিত করেন যে একটি দেশ হিসেবে একটি মাত্র আঘাতেই মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠন করতে সক্ষম। তবে, ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে এ অঞ্চলটি এত সহজে বাঁক নেয় না।

তবু ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের পেছনে চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

প্রথমত, একটি সংক্ষিপ্ত অভিযানের পর ওয়াশিংটন ঘোষণা করে যে এটি তার উদ্দেশ্য অর্জন করেছে। এটি এমন একটি দৃশ্য, যা ট্রাম্প বারবার যে ‘দুই বা তিন দিনের’ কথা বলছেন, তার সঙ্গে খাপ খায়। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, যার ফলে একাধিক ফ্রন্ট খুলে যায়, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় যুদ্ধ’ শুরু করার ঘোষণা দেয় এবং ইসরায়েলের আক্রমণের পাশাপাশি বিস্তৃত পরিসরে ইরানে আক্রমণ শুরু করে। এমন পরিস্থিতি হলে তা মধ্যপ্রাচ্যকে জ¦লন্ত অবস্থা সহ্য করার ক্ষমতার একটি নতুন পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেবে।

তৃতীয়ত, যুদ্ধকে আলোচনায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। এ ক্ষেত্রে শাসনগোষ্ঠীকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আলোচনার টেবিলে জোর করার জন্য ‘সাজানো হামলা,’ যেখানে যুদ্ধ মঞ্চের বাইরে দরকষাকষির একটি অস্ত্রে পরিণত হয়।

চতুর্থত, প্রক্সি সংঘাতের দিকে ঝুঁকে পড়া, যা এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ইরানের দ্রুত প্রতিশোধমূলক হামলায় ইন্ধন জুগিয়েছে, যেন তেহরান ঘোষণা করছে যে তারা ওয়াাশিংটনকে একা পরিস্থিতি তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে দেবে না।

বিদেশে হস্তক্ষেপ সম্পর্কে ট্রাম্পের তিনটি নিয়ম রয়েছে। প্রথমত, বিদেশে সামরিক অভিযানগুলো ‘এককালীন পদক্ষেপ’ হতে হবে। যেমন : দ্রুত আক্রমণ, যা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ‘কোনো আমেরিকান হতাহত না হওয়া’ উচিত। তিনি ইতিমধ্যেই এ নিয়মগুলো ভঙ্গ করেছেন অথবা অন্তত স্বীকার করেছেন যে তিনি সম্ভবত তা ভঙ্গ করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তবে, তৃতীয় নিয়ম কোনো স্থল সেনা মোতায়েন না করা, যা বেশিরভাগ বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন যে তিনি লঙ্ঘন করবেন না।

ট্রাম্প তার বিবৃতিতে ইরানি জনগণকে বলেছিলেন : ‘এখন তোমাদের পালা।’ তিনি যেন বলছেন, ‘আমি (ইরানের) শাসকগোষ্ঠীর মারাত্মক ক্ষতি করব, কিন্তু সৈন্য পাঠাব না। যখন আমার কাজ শেষ হবে, তখন দায়িত্ব তোমাদেরই হবে।’

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প এবারের অভিযানকে ‘আমেরিকান জনগণকে রক্ষা’ এবং ‘ইরানি হুমকি দূর করার’ একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং ইরানিদের ‘তাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে ভাষার আরেকটি স্তর স্পষ্ট হয়। তা হলো, যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি প্রকল্প অথবা অন্তত এর হুমকি। এটি পুরনো আমেরিকান আখ্যানে ফিরে আসা, যেখানে কল্পনা করা হয় যে সামরিক চাপ মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠিত করতে পারে।

যাই হোক, অঞ্চলটি শিখেছে কীভাবে আঘাত গ্রহণ করতে হয় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে নিজেকে পুনর্গঠন করতে হয়।

পরিশেষে, ট্রাম্পের বক্তব্য কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো, যা তাকে যেকোনো উপায়ে কাজ করতে সক্ষম করে। তিনি যুদ্ধকে উন্মুক্ত সম্ভাবনার জগতে রাখেন এবং দাবি করার অধিকার সংরক্ষণ করেন যে তিনি সঠিক পথ বেছে নিয়েছেন, তা যাই হোক না কেন।

এটি এমন একজন ব্যক্তির ভাষা, যিনি জানেন যে ক্ষমতা শুধু কোনো কিছুর ইতি টানার মধ্যে নয়, বরং অন্যদের অপেক্ষা করানোর মধ্যেই নিহিত।

যাই হোক, এর কোনোটিই ইরানি জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করে না, যারা স্বাধীনতার ধারণাকে দম বন্ধ করে দেয়, এমন একটি ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে নিজেদের মুক্তি দিতে চাইছে, না এই অঞ্চলের অন্যান্য জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করে, যারা মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানের আধিপত্যবাদী নীতির শিকার হয়েছে। আসলে বেশিরভাগ মানুষ ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পতন এবং এ ইরানকে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে ফিরে আসার দিকে তাকিয়ে আছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত