‘দ্য সামার ডে’
এই কবিতাটি তার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রায়ই উদ্ধৃত কবিতা। এটি জীবনের ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য এবং নিজের দায়িত্ব নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। কবিতার শেষের চরণটি কালজয়ী : ‘বলো, তোমার এই একটিমাত্র বন্য ও মহামূল্য জীবন দিয়ে তুমি কী করবে?’
‘ওয়াইল্ড গিজ’
এই কবিতা মানবতার কাছে একটি মুক্তির বার্তা বহন করে। এটি ঘোষণা করে যে অনুতাপ বা নিজেকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং নিজের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তিকে ভালোবাসতে দেওয়াই যথেষ্ট। কবিতাটি পাঠককে সান্ত্বনা দিয়ে শেষ হয় : ‘... এই বিশ্ব নিজেকে তোমার কল্পনায় উৎসর্গ করে,/ডাকে তোমাকে পাখির মতো কর্কশ ও রোমাঞ্চকর ডাকে,/বারবার জানিয়ে দেয় জিনিসপত্রের পরিবারে তোমার স্থান।’
‘দ্য জার্নি’
এটি আত্ম-উদ্ধার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের কবিতা। এখানে কবি বর্ণনা করেছেন কীভাবে বাইরের কণ্ঠস্বর পেছনে ফেলে নিজের অন্তরের কণ্ঠস্বরকে চিনতে ও তাকে অনুসরণ করতে হয়।
মেরি অলিভারের কবিতার ভাষা সুবোধ্য, কথ্য, প্রায় গদ্যের মতো। কিন্তু এই সরলতাই তার সবচেয়ে বড় শিল্পকৌশল। তিনি চাইতেন, কবিতা পাঠকের সঙ্গে কথা বলবে, তাকে ভয় দেখাবে না। ছোট লাইন, সাধারণ শব্দ, দৃশ্যভিত্তিক চিন্তা, প্রশ্ন দিয়ে শেষ হওয়া কবিতা এসব তার কাব্যশৈলী। তার কবিতা প্রকৃতির শান্ত ঘটনাবলি নিয়ে : হামিংবার্ড, ইগ্রেট, স্থির পুকুর, সাপ, চাঁদের পর্যায়, হাম্পব্যাক তিমি ইত্যাদি। তার রচনা ছবির মতো জীবন্ত।
মেরি অলিভার এমন কবি যিনি আধুনিক মানুষের ক্লান্ত আত্মার জন্য লিখেছেন। তার কবিতা চেঁচামেচি করে না। এগুলো পাশে বসে থাকে। তিনি আমাদের শেখান, জীবন মানে সমস্যার সমাধান নয়, জীবন মানে উপস্থিত থাকা। এ কারণে তিনি শুধু কবি নন, অনেক পাঠকের কাছে এক ধরনের নীরব আধ্যাত্মিক শিক্ষক।
মেরি অলিভারের উত্তরাধিকার শুধু কবিতার স্তবকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেটি জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, বিস্ময়ের প্রতি নিজেকে উন্মুক্ত রাখা এবং এই ভঙ্গুর পৃথিবীতে উপস্থিত থাকার এক আজীবন আমন্ত্রণ। প্রকৃতির মর্মরধ্বনিতে তিনি যে প্রার্থনা ও দর্শন খুঁজে পেয়েছেন, তা তাকে আঘাতময় শৈশব থেকে রক্ষাকারী সৌন্দর্যে পরিণত করেছিল।
মেরি অলিভারের কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের ‘একটিমাত্র বন্য ও মহামূল্য জীবন’ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের কাজ হলো সেই সম্পর্ককে সচেতনভাবে উপভোগ করা, মনোযোগ দিয়ে দেখার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে গড়ে তোলা। মেরি অলিভার সেই বিরল কবি, যিনি প্রকৃতিকে আমাদের আয়না করে দেখিয়েছেন যে কীভাবে আমাদের নিজেদের আত্মাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
মেরি অলিভারের কিছু কবিতা
তোমাকে ভালো হতে হবে না।
হাঁটু গেড়ে মরুভূমির ভেতর দিয়ে
শত মাইল অনুতাপ টেনে নিয়ে যেতে হবে না।
শুধু নিজের শরীরের নরম প্রাণীটাকে
সে যা ভালোবাসে তাকে ভালোবাসতে দাও।
আমাকে বলো তোমার হতাশার কথা,
আমি বলব আমারটা।
আর পৃথিবী ঘুরতেই থাকবে।
এদিকে সূর্য আর স্বচ্ছ কাঁকর
বৃষ্টি-আবৃত তৃণভূমি পেরিয়ে যাচ্ছে,
গভীর গাছের দিকে, পাহাড়ের দিকে, নদীর দিকে।
এদিকে বন্য রাজহাঁসেরা, উঁচু নীল আকাশে,
ফিরে আসার ডাক দিচ্ছে।
যেই হও না কেন, একাকী হোক বা না হোক,
পৃথিবী নিজেকে তোমার কল্পনায় তুলে ধরছে,
আর ডেকে বলছে
তুমি পৃথিবীর পরিবারের একজন।
২.
কে এই ঘাসফড়িং?
এই ঘাসফড়িংটাই বা কী?
আমি তাকে হাতে তুলে নিয়েছি,
তার মুখের দিকে তাকিয়েছি।
সে নিজেকে ধুয়ে নিচ্ছে,
পা-পা,
চোয়াল ঘষছে।
সে ঘাসের ভেতর থেকে কী খাচ্ছে?
কীভাবে সে লাফায়,
আর আকাশে উড়ে যায়?
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো
তুমি তোমার একমাত্র বন্য, মূল্যবান জীবনটি
কীভাবে কাটাতে চাও?
৩.
যখন মৃত্যু আসে
হিমশীতল বাতাসের মতো,
বা গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো
আমি চাই না তখন কেউ বলুক
সে তো তার জীবন বাঁচিয়ে রাখল।
আমি চাই,
আমি যেন পুরোপুরি পুড়ে যাই,
শেষ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়ে যাই।
আমি চাই,
আমি যেন পৃথিবীর এক আত্মীয় হই,
অচেনা নয়।
৪.
প্রতিদিন
পৃথিবী আমাকে জিজ্ঞেস করে
তুমি আজ কী করবে?
আমি বলি
আমি মনোযোগ দেব।
৫.
হ্যালেলুইয়া!
এটাই একমাত্র শব্দ
যা সত্যি বলতে পারি।
সূর্য উঠছে,
ঘাস আলোয় ভরে যাচ্ছে,
আর আমি বেঁচে আছি।
হ্যালেলুইয়া।
৬.
আমি ভেবেছিলাম
আমি পৃথিবীর ভেতরে আছি,
কিন্তু পৃথিবী নই।
রাতে বনের ভেতর ঘুমিয়ে
আমি বুঝলাম
আমি আর আলাদা নই।
পাতা, ঘাস, নীরবতা
আমাকে গ্রহণ করল।
ভয় চলে গেল।
আমি মুক্ত হলাম।
আমি আবার পৃথিবীর সন্তান।
৭.
পাতা ঝরল।
মেঘ সরে গেল।
কেউ কাঁদল না।
আমি বুঝলাম
বিদায় মানেই শূন্যতা নয়।